
স্ত্রীর গলায় টিউমার। অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না কল্লোল বড়ুয়া। সংসারে নেই পর্যাপ্ত আয়। স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা জোগাড়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেষ ভরসা হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে হাজির হন তিনি।
কল্লোলের মতো আরও কয়েকজন অসহায় মানুষ বুধবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে এসে নিজেদের অসুস্থতা, অভাব ও জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। কারও কর্মক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে পক্ষাঘাত, কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা চালাচ্ছেন। আবার কেউ স্বামী হারিয়ে থ্যালাসেমিয়াসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না।
আবেদনকারীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। পরে চিকিৎসা ও জীবনধারণের জন্য তাঁদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন তিনি।
রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামের কল্লোল বড়ুয়ার স্ত্রী সুরভী বড়ুয়ার গলায় কয়েক মাস আগে টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। এর জন্য প্রয়োজন প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু নিজের অসুস্থতার কারণে কল্লোল নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। ফলে স্ত্রীর চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে পারছিলেন না তিনি।
গণশুনানিতে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরলে কল্লোলের স্ত্রীর চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন জেলা প্রশাসক।
এদিন গণশুনানিতে আসেন রাউজানের কদলপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী হাসনা হেনাও। তাঁর বাবা মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ২০২২ সালে মারা যান। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০০৮ সালে এসএসসি পাস করেন হাসনা। তবে স্থায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় বর্তমানে মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
সামান্য আয় দিয়ে দৈনন্দিন খরচ ও চিকিৎসা চালানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নিজের জীবনসংগ্রামের কথা জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরলে তাৎক্ষণিক সহায়তা পান হাসনা।
আনোয়ারার পড়ৈইপাড়া এলাকার ছবি দত্ত বর্তমানে নগরের মতিঝর্ণা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি নিজে শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন। তাঁর স্বামীও অসুস্থ। দুজনের চিকিৎসা, ওষুধ ও সংসারের খরচ চালানোর মতো নির্ভরযোগ্য কোনো আয়ের উৎস নেই। কোনো উপায় না পেয়ে তিনিও জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে এসে সহায়তা চান।
রাঙ্গুনিয়ার পারুয়া ইউনিয়নের সৈয়দনগর গ্রামের মো. রাশেদ দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও তাঁর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। দীর্ঘ অসুস্থতায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি।
স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে থাকা রাশেদ উন্নত চিকিৎসার আশায় জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হন। তাঁর সমস্যার কথাও মনোযোগ দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক এবং সহায়তা দেন।
অন্যদিকে উত্তর আগ্রাবাদের দিলুয়ারা আক্তার সুলতানার স্বামী ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি হৃদ্রোগে মারা যান। দিলুয়ারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থ্যালাসেমিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। থ্যালাসেমিয়ার কারণে তাঁকে প্রতি তিন মাস পরপর রক্ত নিতে হয়। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যয়বহুল ওষুধও সেবন করতে হয়।
দিলুয়ারার একমাত্র সন্তান স্বল্প বেতনে চাকরি করেন। কিন্তু সেই আয় দিয়ে মায়ের চিকিৎসার পুরো ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে গণশুনানিতে এসে তিনিও সহায়তার আবেদন জানান।
প্রত্যেক আবেদনকারীর গল্প আলাদা হলেও তাঁদের সংকটের জায়গা প্রায় একই—অসুস্থতা, আর্থিক অনটন আর টিকে থাকার লড়াই।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম শুধু আবেদনপত্র দেখে তাঁদের বিদায় দেননি। ধৈর্য ধরে প্রত্যেকের কথা শুনেছেন এবং প্রয়োজন বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ফলে অসহায় মানুষের কাছে সাপ্তাহিক এই গণশুনানি শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিপদের সময়ে সহায়তার আশায় ছুটে আসার একটি ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
দেশ বাংলা অনলাইন 









