ঢাকা ০১:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিভিন্ন দেশে এস আলমের সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত

বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে (এস আলম) ঘিরে আইনি ও আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত চলছে। তার এই সাম্রাজ্য চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পাচার করা অর্থ দিয়েই এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এস আলম।

চলতি বছরের মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তার বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সাইপ্রাসে তার ও তার স্ত্রীর নামে থাকা একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়, বাংলাদেশে একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতেই তাকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। আর সিঙ্গাপুরে তদন্তকারীরা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। শুধু সিঙ্গাপুরেই তার সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বলে জানা গেছে।

এখন নজর কুয়ালালামপুরের দুটি বিলাসবহুল হোটেলের দিকে। হোটেল দুটি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এগুলো হলো কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর পাশের ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার।

হোটেল দুটির মালিক ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি (আগে নাম ছিল ক্যানালি লজিস্টিকস এসডিএন বিএইচডি)। এটি এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে আইজিবি বিএইচডি (ওই সময় নাম ছিল আইজিবি কর্প বিএইচডি) মূল রেনেসাঁ হোটেলটি ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করেছিল।

কোম্পানি-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের শতভাগ মালিকানা রয়েছে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডির হাতে। আবার এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছেন ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ইয়ি এবং আরিভালাগান চোকালিংগাম। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন।

ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের প্রধান কাজ হলো আর্থিক ও বিমাবহির্ভূত খাতে সক্রিয় কোম্পানিগুলোর হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। এর শেয়ারহোল্ডার হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক চু কি সিয়ং। একইসঙ্গে তিনি হিলড্রিকস ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা।

হিলড্রিকস ক্যাপিটালের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাবার কম্পাউন্ড প্রস্তুতকারী ও পরিবেশক জিআইআইবি হোল্ডিংস বিএইচডি।

এর আগে হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড–১-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড জিআইআইবির ১৬.৫৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। তবে কিছু শেয়ার বিক্রির পর তারা আর উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকেনি।

জিআইআইবি দুর্নীতি তদন্ত, করপোরেট ভীতি প্রদর্শন, আইনি বিরোধ ও আর্থিক ক্ষতির মতো নানা কারণে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে, ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কার কাজের জন্য ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল রেনেসাঁ হোটেলটি বন্ধ করে দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি মালয়েশিয়ায় ম্যারিয়টের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে পুনরায় চালু হয়। পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ এবং পূর্ব অংশে নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন পরিচালিত হচ্ছে। ম্যারিয়টের সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো উভয় হোটেলের মালিক হিসেবে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের নাম উল্লেখ রয়েছে।

এ মুহূর্তে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বা সম্পত্তিগুলোর ওপর জব্দাদেশ জারি হয়েছে- এমন কোনো তথ্য নেই।

তবে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সি পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক তদন্তের কারণে, বাংলাদেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলম-সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ঘটনার সময়কাল কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর সফর

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথময় বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। জানা গেছে, প্রথম আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে, এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের কাছ থেকে।

গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার সফরটি নিশ্চিত হয়। সে হিসেবে আগামী ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফরের কথা রয়েছে। সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ারও কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২৪ মে বাংলাদেশের হাইকমিশন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। একই সপ্তাহে, ১৯ মে, সাইপ্রাসের আদালত এস আলমের সম্পত্তি জব্দ করেছিল। এরপর হাইকমিশনের সঙ্গে আলোচনার পর মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয়। ১ জুন আনোয়ার ইব্রাহিম আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করেন।

সফরে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত দুটি ম্যারিয়ট-ব্র্যান্ডের হোটেল রয়েছে। কুয়ালালামপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থিত এই সম্পদগুলোর উপস্থিতি পর্যবেক্ষকদের নজর এড়াবে না।

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা। আধুনিক যুগের ঋণদাসত্বের অভিযোগ এবং কর্মীদের অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততার মতো অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সাল থেকে এই শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে।

২০২৩ সালে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন অনেক শ্রমিক প্রায় ৬,৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করে মালয়েশিয়ায় এসে দেখতে পান, নিয়োগদাতাদের প্রতিশ্রুত চাকরিই বাস্তবে নেই। ২০২৪ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া শ্রমিক প্রবেশ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ করা প্রায় ১৮ হাজার কর্মী আর দেশটিতে যেতে পারেননি।

নতুন সরকারের অভিযানের মুখে এসব নিয়োগ এজেন্টের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাজনীতিবিদ ও এই নিয়োগ এজেন্টরা যোগসাজশের মাধ্যমে শ্রম রপ্তানি খাত থেকে বড় ধরনের সুবিধা নিতেন।

জনশক্তি খাতের এক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগ পুনরায় চালু করা তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য। কারণ, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

তবে তার ভাষ্য- বাংলাদেশ বর্তমান নিয়োগব্যবস্থা চালু রাখতে চায় না। তারা চায়, মালয়েশিয়া সরকার প্রভাবশালী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বেশি বাংলাদেশি কোম্পানিকে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ দিক।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে স্বীকৃত ১০২টি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ৪৩২টি নিয়োগ সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম আবদুল নূর জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের নতুন সরকার আমিনুল এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। বিষয়টি এখনো দুই দেশের সরকারের পর্যায়ে আলোচনাধীন।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সম্পদ পুনরুদ্ধার ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থান পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এমন এক সময়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যে রয়েছে, যখন মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদ নিয়ে নজরদারি এবং শ্রমবাজার পুনরায় চালুর চাপ উভয়ই বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কুয়ালালামপুরে ৯১৯ কক্ষবিশিষ্ট এই হোটেল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির জন্য বাজারে তোলা না হলেও কয়েক বছর আগে সম্ভাব্য বিক্রিমূল্য হিসাবে প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অনেক এজেন্টের মতে, দামটি বেশি এবং প্রকৃত মূল্যায়ন ৮৫০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের মধ্যে হওয়াই বেশি যৌক্তিক।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

সমাজসেবায় অবদানের জন্য ‘মাদার তেরেসা পিস অ্যাওয়ার্ড মনোনীত হলেন চুনতির কৃতি সন্তান কফিল উদ্দিন লিটু

বিভিন্ন দেশে এস আলমের সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত

প্রকাশিত: ১২:০১:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে (এস আলম) ঘিরে আইনি ও আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে তদন্ত চলছে। তার এই সাম্রাজ্য চট্টগ্রাম থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পাচার করা অর্থ দিয়েই এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এস আলম।

চলতি বছরের মে মাসে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তার বিরুদ্ধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সাইপ্রাসে তার ও তার স্ত্রীর নামে থাকা একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়, বাংলাদেশে একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতেই তাকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। আর সিঙ্গাপুরে তদন্তকারীরা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। শুধু সিঙ্গাপুরেই তার সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বলে জানা গেছে।

এখন নজর কুয়ালালামপুরের দুটি বিলাসবহুল হোটেলের দিকে। হোটেল দুটি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এগুলো হলো কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর পাশের ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার।

হোটেল দুটির মালিক ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি (আগে নাম ছিল ক্যানালি লজিস্টিকস এসডিএন বিএইচডি)। এটি এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে আইজিবি বিএইচডি (ওই সময় নাম ছিল আইজিবি কর্প বিএইচডি) মূল রেনেসাঁ হোটেলটি ৭৬৫ মিলিয়ন রিঙ্গিতে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করেছিল।

কোম্পানি-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের শতভাগ মালিকানা রয়েছে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডির হাতে। আবার এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আছেন ওং ওয়াই চিয়ং, পু সিন ইয়ি এবং আরিভালাগান চোকালিংগাম। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন।

ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের প্রধান কাজ হলো আর্থিক ও বিমাবহির্ভূত খাতে সক্রিয় কোম্পানিগুলোর হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা। এর শেয়ারহোল্ডার হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক চু কি সিয়ং। একইসঙ্গে তিনি হিলড্রিকস ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী, নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা।

হিলড্রিকস ক্যাপিটালের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে রয়েছে মালয়েশিয়ার রাবার কম্পাউন্ড প্রস্তুতকারী ও পরিবেশক জিআইআইবি হোল্ডিংস বিএইচডি।

এর আগে হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড–১-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচএজিএফ ইনভেস্টমেন্ট (আই) পিটিই লিমিটেড জিআইআইবির ১৬.৫৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। তবে কিছু শেয়ার বিক্রির পর তারা আর উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকেনি।

জিআইআইবি দুর্নীতি তদন্ত, করপোরেট ভীতি প্রদর্শন, আইনি বিরোধ ও আর্থিক ক্ষতির মতো নানা কারণে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে, ২০২০ সালে বড় ধরনের সংস্কার কাজের জন্য ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল রেনেসাঁ হোটেলটি বন্ধ করে দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটি মালয়েশিয়ায় ম্যারিয়টের প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে পুনরায় চালু হয়। পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ এবং পূর্ব অংশে নতুন ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন পরিচালিত হচ্ছে। ম্যারিয়টের সরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো উভয় হোটেলের মালিক হিসেবে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের নাম উল্লেখ রয়েছে।

এ মুহূর্তে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বা সম্পত্তিগুলোর ওপর জব্দাদেশ জারি হয়েছে- এমন কোনো তথ্য নেই।

তবে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সি পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক তদন্তের কারণে, বাংলাদেশের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকা এস আলম-সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলোও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ঘটনার সময়কাল কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর সফর

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথময় বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। জানা গেছে, প্রথম আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে, এরপর মালয়েশিয়া এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের কাছ থেকে।

গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার সফরটি নিশ্চিত হয়। সে হিসেবে আগামী ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফরের কথা রয়েছে। সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ারও কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২৪ মে বাংলাদেশের হাইকমিশন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। একই সপ্তাহে, ১৯ মে, সাইপ্রাসের আদালত এস আলমের সম্পত্তি জব্দ করেছিল। এরপর হাইকমিশনের সঙ্গে আলোচনার পর মালয়েশিয়া ইতিবাচক সাড়া দেয়। ১ জুন আনোয়ার ইব্রাহিম আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ নিশ্চিত করেন।

সফরে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও অভিবাসন, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য এমন একটি দেশকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে এস আলম গ্রুপের সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত দুটি ম্যারিয়ট-ব্র্যান্ডের হোটেল রয়েছে। কুয়ালালামপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থিত এই সম্পদগুলোর উপস্থিতি পর্যবেক্ষকদের নজর এড়াবে না।

সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা। আধুনিক যুগের ঋণদাসত্বের অভিযোগ এবং কর্মীদের অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ততার মতো অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সাল থেকে এই শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে।

২০২৩ সালে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন অনেক শ্রমিক প্রায় ৬,৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করে মালয়েশিয়ায় এসে দেখতে পান, নিয়োগদাতাদের প্রতিশ্রুত চাকরিই বাস্তবে নেই। ২০২৪ সালের শুরুতে মালয়েশিয়া শ্রমিক প্রবেশ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ করা প্রায় ১৮ হাজার কর্মী আর দেশটিতে যেতে পারেননি।

নতুন সরকারের অভিযানের মুখে এসব নিয়োগ এজেন্টের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাজনীতিবিদ ও এই নিয়োগ এজেন্টরা যোগসাজশের মাধ্যমে শ্রম রপ্তানি খাত থেকে বড় ধরনের সুবিধা নিতেন।

জনশক্তি খাতের এক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগ পুনরায় চালু করা তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য। কারণ, প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

তবে তার ভাষ্য- বাংলাদেশ বর্তমান নিয়োগব্যবস্থা চালু রাখতে চায় না। তারা চায়, মালয়েশিয়া সরকার প্রভাবশালী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বেশি বাংলাদেশি কোম্পানিকে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ দিক।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে স্বীকৃত ১০২টি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ৪৩২টি নিয়োগ সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা দাতুক সেরি আমিনুল ইসলাম আবদুল নূর জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের নতুন সরকার আমিনুল এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। বিষয়টি এখনো দুই দেশের সরকারের পর্যায়ে আলোচনাধীন।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সম্পদ পুনরুদ্ধার ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থান পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এমন এক সময়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যে রয়েছে, যখন মালয়েশিয়ায় এস আলমের সম্পদ নিয়ে নজরদারি এবং শ্রমবাজার পুনরায় চালুর চাপ উভয়ই বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কুয়ালালামপুরে ৯১৯ কক্ষবিশিষ্ট এই হোটেল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির জন্য বাজারে তোলা না হলেও কয়েক বছর আগে সম্ভাব্য বিক্রিমূল্য হিসাবে প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অনেক এজেন্টের মতে, দামটি বেশি এবং প্রকৃত মূল্যায়ন ৮৫০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের মধ্যে হওয়াই বেশি যৌক্তিক।