
দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে আরও একটি সিইটিপি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় ট্যানারিগুলোতে পৃথক বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ২০তম কার্যদিবসে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় পার্টির সেক্রেটারি আলহাজ শাহজাহান চৌধুরীর ৩০০ বিধিতে দেওয়া দৃষ্টি আকর্ষণ নোটিশের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান।
দৃষ্টি আকর্ষণ নোটিশে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যশিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, রপ্তানি সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর সিইটিপি-সংকট দ্রুত সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে প্রায় ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় করা এ খাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে। কমপ্লায়েন্স সংকট ও সিইটিপির সীমাবদ্ধতার কারণে এক লাখের বেশি শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সনদ না থাকায় বড় বড় বৈশ্বিক ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন।
তিনি কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মনিটরিং কমিটি গঠন, রপ্তানিতে নগদ সহায়তা বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা এবং কাঁচা চামড়া পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর সৃষ্ট কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত সমস্যাই বর্তমানে চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়িয়ে দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধনের উপযোগী করা হবে। পাশাপাশি আরও একটি সিইটিপি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত এলডব্লিউজি (LWG) সনদ অর্জনের জন্য পরিবেশগত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু অনেক ট্যানারিতে পৃথক ইটিপি না থাকায় তারা সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার কমেছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কাঁচা চামড়ার দাম ও চাহিদার ওপর।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট আকারের সব ট্যানারিতে পৃথক ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মান অর্জন করে এলডব্লিউজি সনদ পেতে পারেন।
কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিতরণ করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, লিফলেট বিতরণ এবং গণসচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হয়েছে। চলতি বছর ঈদুল আজহায় প্রায় এক কোটি এক লাখ পশু কোরবানি হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ চামড়া সাভারের ট্যানারিগুলোতে পৌঁছেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, আর্থিকভাবে টিকে থাকতে অক্ষম ট্যানারিগুলো চিহ্নিত করে তাদের জন্য ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের গৃহীত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স অর্জন করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে এবং ভবিষ্যতে এ খাত থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রপ্তানি আয় করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 

