ঢাকা ১১:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

সাতকানিয়ায় বাড়ছে বন্যার পানি

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় খাল-বিল উপচে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এরই মধ্যে বুধবার (৮ জুলাই) সকাল থেকে পল্লী বিদ্যুৎ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)—উভয় সংস্থার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিকেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে।

তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, আজ সকাল থেকে বাজালিয়া চৌধুরী পাড়ায় এলাকায় সাঙ্গু নদীর বেড়িবাঁধের দুই ফুট উপর দিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। বিগত ১৯৯৭ ও ২৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় এ স্থানে ভাঙনের ফলে হয়েছে। পরবর্তীতে ওই ভাঙন স্থানে মেরামত ও আরসিসি গাইড ওয়াল করলেও দুই ওয়ালের মাঝখানে কিছু অংশ খালি রাখা হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা দুই গাইড ওয়ালের খালি অংশে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে গেলে আবারো সে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেবে।

পানিবন্দি মানুষের বিশুদ্ধ পানির সংকট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন এবং শিক্ষা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নের জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে সাতকানিয়া আদালত চত্বর ও আদালত ভবনও। আদালত কক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় বুধবার বিচারিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ছিলো।
সাতকানিয়া আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এডিশনাল জিপি) মো. রাশেদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আদালত চত্বর ও আদালত কক্ষে হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক পরিবেশে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডলু নদীর পানি বেড়ে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরও প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। পরিষদ মাঠের বিস্তীর্ণ অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ এলাকাসংলগ্ন সড়কেও পানি ওঠায় দুর্ভোগ বেড়েছে। আদালত চত্বরের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ এলাকাও জলমগ্ন হয়ে পড়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও বন্যার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাঙ্গু নদী, ডলু নদী এবং বিভিন্ন খাল-বিলের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বাজালিয়া, এওচিয়া, ছদাহা, কেঁওচিয়া, খাগরিয়া, ঢেমশা, চরতী, সোনাকানিয়া, আমিলাইষ, পশ্চিম ঢেমশাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। অনেক বাড়িঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও সংযোগ সড়ক। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের সত্যপীর মজার এলাকায় তলিয়ে গেছে সড়ক। এছাড়া করাইয়া নগর সাতকানিয়া সদর সড়কের সরকারি কলেজের হোস্টেলের সামনে বন্যার পানির প্রবল স্রোতে সড়ক ভেঙে গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসিন্দারা যাতায়াত করছেন। এছাড়া উপজেলার অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি ওঠায় স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। নলুয়ার মরিচ্ছা পাড়ার লোকজন নৌকা নিয়ে কেরানীহাটসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করছেন।

এদিকে কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।

বাজালিয়া ইউনিয়নের বড়দুয়ারার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এখানে অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষের ঘরের আসবাবপত্র ও খাবার সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছেন এখানকার পানিবন্দিরা।

নলুয়া ইউনিয়নের মরফলার সাবের আহমেদ বলেন, আমাদের আশেপাশের অনেকের বাড়ি বন্যায় ডুবেছে। তারা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে।

বাজালিয়ার ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এভাবে আরও কয়েক দিন পানি থাকলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ব।

ছদাহার মৎস্য চাষী মোঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানি বাড়লে প্রজেক্ট ভেঙে সব মাছ ভেসে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

বন্যার দুর্ভোগের মধ্যেই বুধবার সকাল থেকে সাতকানিয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ পরিবারের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। ফলে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, অফিসের কাজ, অনলাইন কার্যক্রম এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ, সাবমার্সিবল পাম্প ও পানির মোটর চালানো যাচ্ছে না। এতে বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অনেক পরিবার রান্না, খাবার পানি সংগ্রহ এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে চরম সমস্যায় পড়েছে। ফ্রিজ বন্ধ থাকায় সংরক্ষিত খাদ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাড়িতে ব্যবহৃত নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরসহ বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারছেন না অনেক রোগী। ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়ালেখাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে এলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে সাপসহ বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রবের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতার কারণে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সরঞ্জাম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক স্থানে মেরামতকাজে বিঘ্ন ঘটছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দ্রুত মেরামত করে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে। মাঠে একাধিক টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে।

টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় উপজেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আজ সকাল থেকে বন্যা কবলিত বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনে গিয়েছি। এছাড়া পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়েছে। উপজেলার বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

সমাজসেবায় অবদানের জন্য ‘মাদার তেরেসা পিস অ্যাওয়ার্ড মনোনীত হলেন চুনতির কৃতি সন্তান কফিল উদ্দিন লিটু

পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

সাতকানিয়ায় বাড়ছে বন্যার পানি

প্রকাশিত: ০৮:২৭:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় খাল-বিল উপচে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এরই মধ্যে বুধবার (৮ জুলাই) সকাল থেকে পল্লী বিদ্যুৎ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)—উভয় সংস্থার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিকেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে।

তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, আজ সকাল থেকে বাজালিয়া চৌধুরী পাড়ায় এলাকায় সাঙ্গু নদীর বেড়িবাঁধের দুই ফুট উপর দিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। বিগত ১৯৯৭ ও ২৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় এ স্থানে ভাঙনের ফলে হয়েছে। পরবর্তীতে ওই ভাঙন স্থানে মেরামত ও আরসিসি গাইড ওয়াল করলেও দুই ওয়ালের মাঝখানে কিছু অংশ খালি রাখা হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা দুই গাইড ওয়ালের খালি অংশে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে গেলে আবারো সে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেবে।

পানিবন্দি মানুষের বিশুদ্ধ পানির সংকট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন এবং শিক্ষা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নের জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে সাতকানিয়া আদালত চত্বর ও আদালত ভবনও। আদালত কক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় বুধবার বিচারিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ছিলো।
সাতকানিয়া আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এডিশনাল জিপি) মো. রাশেদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আদালত চত্বর ও আদালত কক্ষে হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক পরিবেশে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ডলু নদীর পানি বেড়ে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরও প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। পরিষদ মাঠের বিস্তীর্ণ অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ এলাকাসংলগ্ন সড়কেও পানি ওঠায় দুর্ভোগ বেড়েছে। আদালত চত্বরের পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ এলাকাও জলমগ্ন হয়ে পড়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও বন্যার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাঙ্গু নদী, ডলু নদী এবং বিভিন্ন খাল-বিলের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বাজালিয়া, এওচিয়া, ছদাহা, কেঁওচিয়া, খাগরিয়া, ঢেমশা, চরতী, সোনাকানিয়া, আমিলাইষ, পশ্চিম ঢেমশাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। অনেক বাড়িঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও সংযোগ সড়ক। কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের সত্যপীর মজার এলাকায় তলিয়ে গেছে সড়ক। এছাড়া করাইয়া নগর সাতকানিয়া সদর সড়কের সরকারি কলেজের হোস্টেলের সামনে বন্যার পানির প্রবল স্রোতে সড়ক ভেঙে গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসিন্দারা যাতায়াত করছেন। এছাড়া উপজেলার অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি ওঠায় স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। নলুয়ার মরিচ্ছা পাড়ার লোকজন নৌকা নিয়ে কেরানীহাটসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করছেন।

এদিকে কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।

বাজালিয়া ইউনিয়নের বড়দুয়ারার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এখানে অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষের ঘরের আসবাবপত্র ও খাবার সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছেন এখানকার পানিবন্দিরা।

নলুয়া ইউনিয়নের মরফলার সাবের আহমেদ বলেন, আমাদের আশেপাশের অনেকের বাড়ি বন্যায় ডুবেছে। তারা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে।

বাজালিয়ার ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, আমনের বীজতলা ও সবজিখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এভাবে আরও কয়েক দিন পানি থাকলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ব।

ছদাহার মৎস্য চাষী মোঃ রাশেদুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানি বাড়লে প্রজেক্ট ভেঙে সব মাছ ভেসে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

বন্যার দুর্ভোগের মধ্যেই বুধবার সকাল থেকে সাতকানিয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ পরিবারের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। ফলে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, অফিসের কাজ, অনলাইন কার্যক্রম এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ, সাবমার্সিবল পাম্প ও পানির মোটর চালানো যাচ্ছে না। এতে বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অনেক পরিবার রান্না, খাবার পানি সংগ্রহ এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে চরম সমস্যায় পড়েছে। ফ্রিজ বন্ধ থাকায় সংরক্ষিত খাদ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাড়িতে ব্যবহৃত নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরসহ বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারছেন না অনেক রোগী। ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়ালেখাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে এলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে সাপসহ বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রবের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতার কারণে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সরঞ্জাম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক স্থানে মেরামতকাজে বিঘ্ন ঘটছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দ্রুত মেরামত করে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে। মাঠে একাধিক টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে।

টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় উপজেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আজ সকাল থেকে বন্যা কবলিত বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনে গিয়েছি। এছাড়া পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়েছে। উপজেলার বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে।