ঢাকা ০৪:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাত পোহালেই ভোটের রায়: প্রস্তুতির শেষ প্রান্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন বিপুলসংখ্যক ভোটার। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ঘিরে জনমনে দেখা দিয়েছে উৎসবমুখর আবহ ও প্রবল প্রত্যাশা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন; এখন শুধু ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার অপেক্ষা।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একযোগে সারা দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। তবে আচরণবিধি মেনে অনলাইনে প্রচারণা চালানো যাবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
প্রচারণা শেষ হলেও প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ, পোলিং এজেন্ট চূড়ান্তকরণ এবং ভোটের মাঠের হিসাব-নিকাশে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ হবে। একটি আসনে ভোট স্থগিত থাকায় সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না।
দেশজুড়ে ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কেন্দ্র সাধারণ এবং বাকি কেন্দ্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। কমিশন জানিয়েছে, বিকাল সাড়ে ৪টার পরও কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থানরত ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে।
নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত থাকবেন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকবেন দুই হাজারের বেশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রায় এক হাজার বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট।
নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন ও বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্যামেরার সরাসরি ফিড নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও গোলযোগ বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮১ জন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবেন প্রায় ৪৫ হাজার দেশীয় পর্যবেক্ষক, প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ১০ হাজার সাংবাদিক। ইতোমধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সাংবাদিক নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। পাশাপাশি ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীও ভোটের মাঠে লড়ছেন। বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী দিয়েছে। বিভিন্ন জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কিছু রাজনৈতিক দল কালো টাকা বিতরণ ও অনিয়মের আশঙ্কার কথাও তুলেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকা বিতরণ করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ব্যবস্থাও আছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৩০০টির বেশি মামলা হয়েছে এবং ৫০০টির বেশি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
ভোটের দিন মোবাইল ফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে কেবল নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক সীমিতভাবে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন। ভোটারদের গোপন কক্ষে মোবাইল নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভোটকেন্দ্রে লাইভ সম্প্রচার কিংবা ভোটার সাক্ষাৎকার গ্রহণও করা যাবে না।
এবার ভোটগ্রহণে দুটি আলাদা ব্যালট ব্যবহৃত হবে। সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা ব্যালট এবং গণভোটের জন্য গোলাপি ব্যালট। দুটি ব্যালটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা ও প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। এতে বিভ্রান্তির সুযোগ থাকবে না। কমিশনের আশা, অধিকাংশ আসনের ফলাফল ভোটের রাতেই জানা যাবে।
নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবার প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের মতে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনুকূল। শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে এবং ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেবে দেশ—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

রাত পোহালেই ভোটের রায়: প্রস্তুতির শেষ প্রান্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

প্রকাশিত: ১০:৩২:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন বিপুলসংখ্যক ভোটার। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ঘিরে জনমনে দেখা দিয়েছে উৎসবমুখর আবহ ও প্রবল প্রত্যাশা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন; এখন শুধু ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার অপেক্ষা।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একযোগে সারা দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। তবে আচরণবিধি মেনে অনলাইনে প্রচারণা চালানো যাবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
প্রচারণা শেষ হলেও প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ, পোলিং এজেন্ট চূড়ান্তকরণ এবং ভোটের মাঠের হিসাব-নিকাশে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ হবে। একটি আসনে ভোট স্থগিত থাকায় সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না।
দেশজুড়ে ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক কেন্দ্র সাধারণ এবং বাকি কেন্দ্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। কমিশন জানিয়েছে, বিকাল সাড়ে ৪টার পরও কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থানরত ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে।
নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত থাকবেন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকবেন দুই হাজারের বেশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রায় এক হাজার বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট।
নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন ও বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্যামেরার সরাসরি ফিড নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও গোলযোগ বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮১ জন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবেন প্রায় ৪৫ হাজার দেশীয় পর্যবেক্ষক, প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ১০ হাজার সাংবাদিক। ইতোমধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সাংবাদিক নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল। পাশাপাশি ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীও ভোটের মাঠে লড়ছেন। বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী দিয়েছে। বিভিন্ন জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কিছু রাজনৈতিক দল কালো টাকা বিতরণ ও অনিয়মের আশঙ্কার কথাও তুলেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকা বিতরণ করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ব্যবস্থাও আছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৩০০টির বেশি মামলা হয়েছে এবং ৫০০টির বেশি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
ভোটের দিন মোবাইল ফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে কেবল নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক সীমিতভাবে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন। ভোটারদের গোপন কক্ষে মোবাইল নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভোটকেন্দ্রে লাইভ সম্প্রচার কিংবা ভোটার সাক্ষাৎকার গ্রহণও করা যাবে না।
এবার ভোটগ্রহণে দুটি আলাদা ব্যালট ব্যবহৃত হবে। সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা ব্যালট এবং গণভোটের জন্য গোলাপি ব্যালট। দুটি ব্যালটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা ও প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। এতে বিভ্রান্তির সুযোগ থাকবে না। কমিশনের আশা, অধিকাংশ আসনের ফলাফল ভোটের রাতেই জানা যাবে।
নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবার প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের মতে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনুকূল। শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে এবং ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেবে দেশ—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।