বড় সব রাজনীতিবিদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর বদনাম আছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের। আর টানা দশ বছর সিডিএ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার দম্ভে দিশেহারা ছিলেন আবদুচ ছালাম। আওয়ামী লীগের এই দুই নেতার কর্তৃত্বেই হয়েছে বন্দরনগরীর উন্নয়ন। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দুইজনই ছিলেন ‘হেভিওয়েট’। নিজেদের ক্ষমতার সময়গুলোতে নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত হয়ে প্রতিপক্ষের তালিকাও দীর্ঘ করেন দুইজন। মাশুল হিসেবে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে ছিঁটকে পড়েছেন নাছির-ছালাম। চমক দিয়ে প্রার্থী হয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নগর আওয়ামী লীগের বিরোধ নিয়ে বিরক্ত দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। হেভিওয়েট দুই নেতা নাছির ও ছালাম মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগের কোন্দল ও নিজেদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে পিছিয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে মেয়র নাছিরের কর্মকান্ড প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিরক্ত ছিলেন। নানা কিছু থেকে মেয়র নাছিরকে বঞ্চিত রেখে প্রধানমন্ত্রী বারবার সেই ইঙ্গিতই দিয়ে গেছেন। ছালাম টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে নগরের দৃশ্যমান উন্নয়নে নেতৃত্ব দিলেও সে উন্নয়নের বড় অবদানটুকু শেখ হাসিনার নিজের। আবার প্লট বরাদ্দ ও চসিক মেয়রের সাথে দ্ব›েদ্ব জড়িয়েও সমালোচিত ছিলেন ছালাম। তাকে মনোনয়ন দিলে সাংগঠনিক দ্ব›দ্ব বাড়তে পারে, যেটি বিবেচনায় নিয়েছে মনোনয়ন বোর্ড। আর সুযোগটি ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে দুই নেতার বিরোধী হিসেবে সক্রিয় থাকা মহিউদ্দিন বলয়। দুই নেতার বিতর্কে বারবার আলোচনায় চলে আসেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন ও যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনীতির মাঠের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা রেজাউল করিম চৌধুরীর উপর আস্থা রেখেছেন।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নেত্রী হয়তো মনে করেছেন, রেজাউল করিমকে মনোনয়ন দিলে আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারবে, সেজন্য তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি মনে করি, নেত্রী সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর যিনি বাদ পড়েছেন তিনি হয়তো চট্টগ্রামবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেননি।’
নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ‘২০১৭ সালে পোমরা পানি শোধনাগার প্রকল্প উদ্বোধনে এসে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন নিয়ে বোট ক্লাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত সেদিন সরাসরি নাছিরের বিরুদ্ধে কিছু না বললেও যা বলেছিলেন তা নাছিরকে ইঙ্গিত করেই। সেদিন মহিউদ্দিন চৌধুরীর উন্নয়নের প্রশংসাও করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই থেকে নাছিরের প্রতি কিছুটা বিরক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। মেয়রকে মন্ত্রীর পদ মর্যাদা না দেয়া, চসিকের পরিবর্তে সিডিএ’র মাধ্যমে ব্যাপক উন্নয়ন করা এসব থেকেও নাছিরের মনোনয়ন না পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তবে নাছিরের অনুগত কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা তার পক্ষে শেষ প্রচেষ্টা পর্যন্ত চালিয়েছেন।’
চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সাথে আলাপকালে জানা যায়, সাংগঠনিক পদ পাওয়ার পর থেকেই নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন আ.জ.ম নাছির উদ্দীন। চসিক মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে আরো বেশি সক্রিয় হন। কিন্তু প্রতিক্ষেত্রেই তিনি নিজস্ব বলয় থেকে বের হতে পারেননি। মিরসরাইয়ের এক বিএনপি নেতার ছেলে নিয়াজ মোর্শেদ এলিটকে ‘আস্কারা’ দিতে গিয়ে বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন নাছির। গত সংসদ নির্বাচনে মিরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন এলিট। এলিটের কারণেই আওয়ামী লীগের বর্ষীয়াণ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সাথে বিরোধ বাড়ে নাছিরের। এছাড়াও জাতিসংঘ পার্ক নিয়েও বিরোধে জড়ান মোশাররফ-নাছির। বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সংসদ সদস্য এমএ লতিফের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ান মেয়র নাছির। ক্যাসিনোকান্ডে বেকায়দায় পড়া হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন সিটি মেয়র। সিডিএ চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে আবদুচ ছালামের সাথে মেয়র নাছিরের দ্ব›দ্ব প্রকাশ্যে আসে। উন্নয়ন ভাগাভাগিতে দুই নেতা একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। মাঝখানে দাপ্তরিক কর্মকান্ডে ছালাম নাছিরের দপ্তরে হাজির হলেও শিথিল হয়নি বিরোধ। আর নগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে আ জ ম নাছিরের বিরোধ নগরবাসীর কাছে নতুন নয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল মহিউদ্দিন বলয়ের কর্তৃত্ব নেন। তবে নাছির ও নওফেলের দ্ব›দ্ব প্রকাশ্যে না আসলেও উভয় নেতার অনুসারীরা একে-অপরের প্রতিপক্ষ হয়েই রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছিলেন। সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন হিসেবে জাহির করতে গিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগকে তুচ্ছ করেছিলেন। নিজের অনুগত কয়েকজন ছাড়া বাকিরা যেন ছালামের কাছে তুচ্ছ। মনোনয়ন দৌড়ের মুহূর্তে দুদকে ছালামের বিরুদ্ধে জমা পড়া প্লট কেলেঙ্কারির একটি ঘটনাও জোরেশোরে আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে শেষ মূহূর্তে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সাথে থাকা নাছিরের একটি ছবি ভাইরাল হলে মনোনয়ন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়েন নাছির। আর প্রকল্প আনতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাঁচ শতাংশ অর্থ প্রদান নিয়ে মুখ খুলে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এছাড়াও গণপূর্তের এক প্রকৌশলীকে থাপ্পড় মেরেও আলোচিত হন মেয়র নাছির।
বাদল, দিয়াজ ও সুদীপ্ত হত্যাকান্ড :
গত পাঁচ বছরে বন্দরনগরীতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের কমপক্ষে ১২ জন নেতাকর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে জোরেশোরেই আলোচিত হয়েছে তিনটি হত্যাকান্ড। বায়েজিদে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেদি হাসান বাদলকে। বাদল আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী ছিলেন। মেয়র অনুসারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনাকে প্রথমদিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হলেও ময়নাতদন্তে এটি হত্যাকান্ড বলে উঠে আসে। বাদল ও দিয়াজ হত্যাকান্ডের আসামিরাও মেয়রের অনুসারী। আ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে আসামিদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগও আছে। কয়েকটি অনুষ্ঠানে দিয়াজের মায়ের তোপের মুখে পড়েন মেয়র। আরেক ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্তকে নালাপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার নির্দেশদাতা হিসেবে লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের নাম উঠে আসে। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় মাসুম কারাগারেও যান। মেয়রের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মাসুমের উপস্থিতি নিয়ে মহিউদ্দিন অনুসারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।
ক্ষুব্ধ ছিলো মহিউদ্দিন পক্ষ :
নগর আওয়ামী লীগ মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির গ্রূপে বিভক্ত। বিভিন্ন সময় এ দুটি ধারায় নেতারা যুক্ত হয়ে দ্বন্দ্বে স্পিড বাড়াতেন। ছাত্রলীগ-যুবলীগেও দুই নেতাকে ঘিরে বিভক্ত নেতাকর্মীরা। ২০১৫ সালে মনোনয়ন চাওয়া নিয়ে মহিউদ্দিন-নাছিরের দ্ব›দ্ব আরো বেড়ে যায়। মহিউদ্দিন চৌধুরী মনোনয়নবঞ্চিত হন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নাছিরের বিরুদ্ধে গৃহকর বাড়ানো নিয়ে মাঠে নামেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। নগরবাসীকে সাথে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে নাছিরকে চাপে ফেলেন মহিউদ্দিন। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা গেলে পুরো বলয়ের কর্তৃত্ব নেন নওফেল। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভায় মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান মহিউদ্দিন পন্থীরা। তখন মেয়রের বিরুদ্ধে মিছিল-সমাবেশও করেন মহিউদ্দিন অনুসারীরা। এর আগে ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনিকে গ্রেপ্তার করে সাজা দেয়ার ঘটনার জন্য নাছিরকেই দোষারোপ করা হয়। এ রনির নেতৃত্বেই গড়ে উঠে সুইমিং পুল বিরোধী আন্দোলন। রনির সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলে যাওয়া ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়ায় মহিউদ্দিন অনুসারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও নাছিরের উপর ক্ষুব্দ ছিলো। জামিনে এসে রনি নিজেও বিভিন্ন সময় নাছিরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কুৎসা রটিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন। এ অংশটি চেয়েছিল মহিউদ্দিন পরিবার থেকেই এবার মেয়র প্রার্থী আসুক। কিন্তু নওফেল এতে অনাগ্রহ দেখালে ‘মন্দের ভালো’ প্রার্থী খুঁজতে থাকে মহিউদ্দিন পক্ষ। শেষতক রেজাউল করিমের পক্ষেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে পক্ষটি। যদিও গণভবনে প্রবেশের আগে নিজে মনোনয়ন না পেলেও সুজন ও রেজাউলের পক্ষেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন মেয়র নাছির।
জলাবদ্ধতা ব্যর্থতা, বিলবোর্ডে সফলতা :
মেয়র নাছিরের নির্বাচনী ইশতিহারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন। বর্ষা মৌসুম ও জোয়ারের পানিতেই নগরীর নিম্নাঞ্চল প্রায়সময় প্লাবিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ব্যর্থ হয়েছেন নাছির। তবে এজন্য বড় প্রকল্প না পাওয়াকেই দায়ী করেছেন তিনি। অন্যদিকে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে মেয়রের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। সৌন্দর্য বাড়াতে রাতারাতি নগরীর বিলবোর্ড উচ্ছেদ করেছেন। বিলবোর্ড উচ্ছেদে ক্ষিপ্ত হয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ মেয়রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে সড়কবিভাজনকে সৌন্দর্য বর্ধন করে প্রশংসিত হয়েছেন মেয়র। ঘরে ঘরে ময়লা-আবর্জন সংগ্রহে নতুন পরিকল্পনাও নগরবাসীর দৃষ্টি কাড়ে। গেল দুই বছর ধরে একুশে বইমেলা আয়োজন করে চট্টগ্রামবাসীকে বইমনস্ক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রেখেছেন মেয়র নাছির।
নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী গুড বুকে স্থান না পেলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া রেজাউল করিমকে জয়ী করতে নির্বাচনী মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। গণমাধ্যমে মেয়র নাছির বলেন, আমি নেত্রীর এ সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী একজন যোগ্য প্রার্থী। তার জয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহানগর আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। নেত্রীর মনোনীত নৌকার প্রার্থীকে ভোটে জিতিয়ে এনে চট্টগ্রামের মেয়র পদটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

দেশ বাংলা ডট নেট ডেস্ক 




















