ঢাকা ১২:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মাটি নেই, জ্বালানি ব্যয় বাড়তি — ধুঁকছে সাতকানিয়ার ইটভাটা শিল্প

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্মাণখাত দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ইটভাটার ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক বছরে কাঁচামালের সংকট, প্রশাসনিক কড়াকড়ি, পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি—এই বহুমাত্রিক সমস্যায় ভুগছে এখানকার ইটভাটা শিল্প। একসময় মৌসুমজুড়ে ব্যস্ত থাকা বহু ভাটা এখন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে।

কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন ব্যাহত

ভাটা মালিকদের দাবি, মাটি সংগ্রহে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং প্রশাসনিক অভিযানের কারণে কাঁচামাল জোগাড় করা কঠিন হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য—পরিবেশ রক্ষা ও কৃষিজমি সংরক্ষণে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
সাতকানিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইট উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অসংখ্য ভাটা ছড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় আবাসন, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো উন্নয়নে এসব ভাটার উৎপাদিত ইট প্রধান নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগেও মৌসুমভিত্তিক ৭৩টির বেশি ইটভাটা সক্রিয় ছিল। এসব ভাটায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে অনেক ভাটা বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কিছু সীমিত উৎপাদনে চলছে।

টপসয়েল কাটায় কড়াকড়ি

ইট তৈরির প্রধান উপাদান মাটি। কৃষিজমির উর্বর টপসয়েল কাটার অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসন নজরদারি বাড়িয়েছে।
ভাটা মালিকদের ভাষ্য, আগে স্থানীয় জমি থেকে চুক্তির মাধ্যমে মাটি সংগ্রহ করা যেত। এখন আইনগত জটিলতা ও প্রশাসনিক তদারকির কারণে সেই প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, “কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এ অঞ্চলে ইট শিল্প এখন চরম হুমকির মুখে। এভাবে প্রশাসনের বাঁধা নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকলে দুই এক বছরের মধ্যে সাতকানিয়ায় সকল ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে। মাটি জোগাড় করতে না পেরে এ বছর ১৪ টি ইটভাটা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে আগামী বছর ৮০% ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাও প্রতি বছর ইট পোড়ানোর মৌসুমে শ্রমিকরা ৫০-৬০ লাখ টাকা অগ্রীম নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এসব টাকাও উদ্ধার করা যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, ইটভাটার প্রধান উপাদান মাটি। কিন্তু এখন মাটি কাটায় কড়াকড়ি এত বেশি যে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না। মাটি না থাকলে ভাটা চালানোই অসম্ভব। প্রতি বছর একেকটি ইটভাটায় সরকারকে ৭ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব দেন। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে ইট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো সহযোগিতা নাই। বিভিন্ন সময় মিটিং এ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলেছি, কৃষি‌জমির টপ সয়েল কাটার পক্ষে আমরা নয়। আমরা টপ সয়েল কাটলে আপনারা কঠোর ব্যবস্থা নিন। তবে টপ সয়েল ছাড়াও যেসব মাটির উৎস আছে, সেগুলো আমাদেরকে নির্ধারণ করে দেন। আমরা যেন সেখান থেকে মাটি নিতে পারি। না হয় আপনারা ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়ে দেন।”

বিনিয়োগ ঝুঁকিতে, প্রশাসনিক বাধার অভিযোগ

সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির
সভাপতি মোঃ নেজাম উদ্দিন বলেন, “আমরা সরকারের সকল নিয়ম মেনে ইটভাটা স্থাপন করেছি। এরপরেও গত কয়েক বছর ধরে ইটভাটার প্রধান উপাদান মাটি কোনো ভাবে এখন ইট তৈরির জন্য ভাটায় নিতে পারছি না। সবদিকে প্রশাসনের বাঁধা। টপ সয়েল ছাড়াও যেসব মাটি নেওয়ার উৎস আছে, সেখান থেকেও মাটি নিতে পারছি না।
তিনি আরো বলেন,
প্রতিটি ইটভাটায় ৫ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। এতো টাকা বিনিয়োগ করেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় মাটি জোগাড় করতে না পারায় ইট শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।”

প্রশাসনের অবস্থান

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটার ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই আইন অনুযায়ী ভাটা পরিচালনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
খোন্দকার মাহমুদুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বলেন—ইটভাটা প্রয়োজনীয় হলেও পরিবেশের ক্ষতি করে তা চলতে পারে না। অনুমোদনবিহীন ভাটা ও অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

জ্বালানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে

কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ভাটা মালিকদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে ইটের দাম বাড়ালে ক্রেতাদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন মালিকরা।
শ্রমিক সংকট ও কর্মসংস্থানে প্রভাব
ইটভাটাগুলো মৌসুমভিত্তিক শ্রমিকনির্ভর। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কাজের নিশ্চয়তা কমেছে, ফলে অনেক শ্রমিক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নির্মাণ খাতে চাপ বাড়ছে

উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে ইটের সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের মতে, আগে মৌসুমে সহজে ইট পাওয়া গেলেও এখন সরবরাহ কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে।
পরিবেশ বনাম শিল্প—সমন্বিত নীতির দাবি
ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ায় এবং মাটি কাটার ফলে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এই উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তাই প্রশাসন ও পরিবেশবিদরা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে।
তবে মালিকদের দাবি, হঠাৎ কঠোর নিয়ন্ত্রণ দিলে নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হাজারো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। তাই সমন্বিত নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।
বিকল্প হিসেবে ব্লক উৎপাদনে জোর
সরকার ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক বা পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্লক ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রশাসনের মতে, ব্লক ব্যবহারে কৃষিজমির মাটি সংরক্ষণ ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব।
তবে ভাটা মালিকরা বলছেন, ব্লক উৎপাদনে রূপান্তর সহজ নয়। এর জন্য বড় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও বাজার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব
সাতকানিয়ায় ইটভাটা শিল্প শুধু নির্মাণ উপকরণ সরবরাহ করে না; এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাটাগুলোতে মৌসুমে বিপুল শ্রমিক কাজ করেন, পরিবহন খাত সচল থাকে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সক্রিয় হয়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই পুরো অর্থনৈতিক চক্রে প্রভাব পড়ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ইটভাটা শিল্প প্রয়োজনীয়, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে তা চলতে পারে না। কৃষিজমির টপসয়েল কাটলে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। তাই আমরা আইন অনুযায়ী কঠোর নজরদারি করছি।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদনবিহীন ভাটা বা অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে মালিকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

 

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

মাটি নেই, জ্বালানি ব্যয় বাড়তি — ধুঁকছে সাতকানিয়ার ইটভাটা শিল্প

প্রকাশিত: ০৫:২০:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা নির্মাণখাত দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ইটভাটার ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক বছরে কাঁচামালের সংকট, প্রশাসনিক কড়াকড়ি, পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি—এই বহুমাত্রিক সমস্যায় ভুগছে এখানকার ইটভাটা শিল্প। একসময় মৌসুমজুড়ে ব্যস্ত থাকা বহু ভাটা এখন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে।

কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন ব্যাহত

ভাটা মালিকদের দাবি, মাটি সংগ্রহে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং প্রশাসনিক অভিযানের কারণে কাঁচামাল জোগাড় করা কঠিন হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য—পরিবেশ রক্ষা ও কৃষিজমি সংরক্ষণে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
সাতকানিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইট উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অসংখ্য ভাটা ছড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় আবাসন, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো উন্নয়নে এসব ভাটার উৎপাদিত ইট প্রধান নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগেও মৌসুমভিত্তিক ৭৩টির বেশি ইটভাটা সক্রিয় ছিল। এসব ভাটায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে অনেক ভাটা বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কিছু সীমিত উৎপাদনে চলছে।

টপসয়েল কাটায় কড়াকড়ি

ইট তৈরির প্রধান উপাদান মাটি। কৃষিজমির উর্বর টপসয়েল কাটার অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসন নজরদারি বাড়িয়েছে।
ভাটা মালিকদের ভাষ্য, আগে স্থানীয় জমি থেকে চুক্তির মাধ্যমে মাটি সংগ্রহ করা যেত। এখন আইনগত জটিলতা ও প্রশাসনিক তদারকির কারণে সেই প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, “কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এ অঞ্চলে ইট শিল্প এখন চরম হুমকির মুখে। এভাবে প্রশাসনের বাঁধা নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকলে দুই এক বছরের মধ্যে সাতকানিয়ায় সকল ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে। মাটি জোগাড় করতে না পেরে এ বছর ১৪ টি ইটভাটা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে আগামী বছর ৮০% ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাও প্রতি বছর ইট পোড়ানোর মৌসুমে শ্রমিকরা ৫০-৬০ লাখ টাকা অগ্রীম নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এসব টাকাও উদ্ধার করা যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, ইটভাটার প্রধান উপাদান মাটি। কিন্তু এখন মাটি কাটায় কড়াকড়ি এত বেশি যে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না। মাটি না থাকলে ভাটা চালানোই অসম্ভব। প্রতি বছর একেকটি ইটভাটায় সরকারকে ৭ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব দেন। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে ইট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো সহযোগিতা নাই। বিভিন্ন সময় মিটিং এ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলেছি, কৃষি‌জমির টপ সয়েল কাটার পক্ষে আমরা নয়। আমরা টপ সয়েল কাটলে আপনারা কঠোর ব্যবস্থা নিন। তবে টপ সয়েল ছাড়াও যেসব মাটির উৎস আছে, সেগুলো আমাদেরকে নির্ধারণ করে দেন। আমরা যেন সেখান থেকে মাটি নিতে পারি। না হয় আপনারা ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়ে দেন।”

বিনিয়োগ ঝুঁকিতে, প্রশাসনিক বাধার অভিযোগ

সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির
সভাপতি মোঃ নেজাম উদ্দিন বলেন, “আমরা সরকারের সকল নিয়ম মেনে ইটভাটা স্থাপন করেছি। এরপরেও গত কয়েক বছর ধরে ইটভাটার প্রধান উপাদান মাটি কোনো ভাবে এখন ইট তৈরির জন্য ভাটায় নিতে পারছি না। সবদিকে প্রশাসনের বাঁধা। টপ সয়েল ছাড়াও যেসব মাটি নেওয়ার উৎস আছে, সেখান থেকেও মাটি নিতে পারছি না।
তিনি আরো বলেন,
প্রতিটি ইটভাটায় ৫ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। এতো টাকা বিনিয়োগ করেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞায় মাটি জোগাড় করতে না পারায় ইট শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।”

প্রশাসনের অবস্থান

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটার ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই আইন অনুযায়ী ভাটা পরিচালনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
খোন্দকার মাহমুদুল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বলেন—ইটভাটা প্রয়োজনীয় হলেও পরিবেশের ক্ষতি করে তা চলতে পারে না। অনুমোদনবিহীন ভাটা ও অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

জ্বালানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে

কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ভাটা মালিকদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে ইটের দাম বাড়ালে ক্রেতাদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন মালিকরা।
শ্রমিক সংকট ও কর্মসংস্থানে প্রভাব
ইটভাটাগুলো মৌসুমভিত্তিক শ্রমিকনির্ভর। উৎপাদন কমে যাওয়ায় কাজের নিশ্চয়তা কমেছে, ফলে অনেক শ্রমিক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নির্মাণ খাতে চাপ বাড়ছে

উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে ইটের সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের মতে, আগে মৌসুমে সহজে ইট পাওয়া গেলেও এখন সরবরাহ কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে।
পরিবেশ বনাম শিল্প—সমন্বিত নীতির দাবি
ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ায় এবং মাটি কাটার ফলে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এই উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তাই প্রশাসন ও পরিবেশবিদরা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে।
তবে মালিকদের দাবি, হঠাৎ কঠোর নিয়ন্ত্রণ দিলে নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হাজারো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। তাই সমন্বিত নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।
বিকল্প হিসেবে ব্লক উৎপাদনে জোর
সরকার ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক বা পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্লক ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রশাসনের মতে, ব্লক ব্যবহারে কৃষিজমির মাটি সংরক্ষণ ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব।
তবে ভাটা মালিকরা বলছেন, ব্লক উৎপাদনে রূপান্তর সহজ নয়। এর জন্য বড় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও বাজার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব
সাতকানিয়ায় ইটভাটা শিল্প শুধু নির্মাণ উপকরণ সরবরাহ করে না; এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাটাগুলোতে মৌসুমে বিপুল শ্রমিক কাজ করেন, পরিবহন খাত সচল থাকে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সক্রিয় হয়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই পুরো অর্থনৈতিক চক্রে প্রভাব পড়ছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ইটভাটা শিল্প প্রয়োজনীয়, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে তা চলতে পারে না। কৃষিজমির টপসয়েল কাটলে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। তাই আমরা আইন অনুযায়ী কঠোর নজরদারি করছি।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদনবিহীন ভাটা বা অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে মালিকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।