ঢাকা ১২:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বান্দরবানে ৩৫০ কোটি টাকার পানি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর অর্থায়নে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়িত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পে’ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল গ্রুপের বিরুদ্ধে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, অগভীরভাবে পাইপ বসানো এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে গাফিলতির অভিযোগে সরব স্থানীয়রা।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চলমান এই প্রকল্পের কাজ বান্দরবান পৌর এলাকায় নতুন পানির লাইন স্থাপন ঘিরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আরএফএল তাদের নিজস্ব কারখানায় তৈরি নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করছে। অধিকাংশ জায়গায় পাইপ বসানোর সময় বালু দেওয়া হচ্ছে না; আবার অনেক এলাকায় লোক দেখানোভাবে সামান্য বালু ছিটিয়ে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে।

আরও অভিযোগ, দিনের বেলা মাটি খুঁড়ে রেখে রাতের আঁধারে পাইপ বসানো হয়, যাতে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া যায়। এ সময় ব্যবহৃত পাইপগুলোও নমুনা পাইপের তুলনায় পাতলা ও নিম্নমানের।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, তারা বারবার কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে ঠিকাদারপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখায়। কেউ বাধা দিতে গেলে “জেলে ঢুকিয়ে দেব” বলে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-র মদদেই এসব অনিয়ম চলছে, কারণ তিনি বড় অঙ্কের কমিশন নেওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক ম্যানেজারের উপস্থিতিতে পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে, কিন্তু কোথাও সঠিক গভীরতায় পাইপ দেওয়া হয়নি। অনেক জায়গায় পাইপের নিচে বালু নেই, ফলে বর্ষায় কাদা জমে সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পৌর এলাকার আনুমানিক ২০ কোটি টাকার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও অভিযোগ তুলেছেন, প্রকল্পে যে পাইপ ব্যবহার হচ্ছে তা অত্যন্ত পাতলা ও টেকসই নয়। তাদের আশঙ্কা, কয়েক বছরের মধ্যেই এসব পাইপ মাটির চাপ ও গাড়ির চাকার ওজন সহ্য করতে না পেরে চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।

কালাঘাটার ফরকান বলেন, “এই পাইপগুলো একেবারেই মানহীন। টেকসই হবে না, কয়েক বছরের মধ্যেই ফেটে যাবে।”
ইসলামপুরের জহির উদ্দিন জানান, “আমাদের এলাকায় রাতে পাইপ বসানো হয়। বললে টাকা দিতে বলে, না দিলে চুপ থাকতে বলে।”

চেয়ারম্যান পাড়ার মুজিবুর রশিদ বলেন, “আমরা যখন কাজ বন্ধ করি, তখন উপর থেকে চাপ আসে। কর্তৃপক্ষ জোর করে কাজ চালিয়ে যায়।”

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাইট ম্যানেজার মো. শাহীন দাবি করেন, “দিনে গর্ত করে রাখতে রাখতে রাত হয়ে যায়, তাই রাতে পাইপ বসাতে হয়। পাইপের মান ভালো, এবং যে ক্ষতি হচ্ছে তা কোম্পানি নিজ খরচে মেরামত করবে।”

পাইপের ছবি তুলতে গেলে স্টোরকিপার জাহেদ হোসেন সাংবাদিকদের বাধা দিয়ে বলেন, “ছবি তুলতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।” নিম্নমানের পাইপের কথা স্বীকার করেই তিনি বলেন, “সব জায়গায় কিছু না কিছু অনিয়ম হয়, এখানেও তাই।”

এদিকে পৌর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলো কবে মেরামত হবে—এ বিষয়ে জানতে বান্দরবান পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ুয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে সাংবাদিকদের বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল কোম্পানি ২৫ শতাংশ কম রেটে কাজ নিয়েছে, তাই কিছুটা হেরফের হতেই পারে। তবে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।”

স্থানীয়দের দাবি, “৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে এই ধরনের নিম্নমানের কাজ শুধু অপচয় নয়, ভবিষ্যতে পুরো শহরকে দুর্ভোগে ফেলবে।” তারা উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

 

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

বান্দরবানে ৩৫০ কোটি টাকার পানি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশিত: ০১:১৫:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর অর্থায়নে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়িত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পে’ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল গ্রুপের বিরুদ্ধে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, অগভীরভাবে পাইপ বসানো এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে গাফিলতির অভিযোগে সরব স্থানীয়রা।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চলমান এই প্রকল্পের কাজ বান্দরবান পৌর এলাকায় নতুন পানির লাইন স্থাপন ঘিরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আরএফএল তাদের নিজস্ব কারখানায় তৈরি নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করছে। অধিকাংশ জায়গায় পাইপ বসানোর সময় বালু দেওয়া হচ্ছে না; আবার অনেক এলাকায় লোক দেখানোভাবে সামান্য বালু ছিটিয়ে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে।

আরও অভিযোগ, দিনের বেলা মাটি খুঁড়ে রেখে রাতের আঁধারে পাইপ বসানো হয়, যাতে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া যায়। এ সময় ব্যবহৃত পাইপগুলোও নমুনা পাইপের তুলনায় পাতলা ও নিম্নমানের।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, তারা বারবার কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে ঠিকাদারপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি দেখায়। কেউ বাধা দিতে গেলে “জেলে ঢুকিয়ে দেব” বলে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে-র মদদেই এসব অনিয়ম চলছে, কারণ তিনি বড় অঙ্কের কমিশন নেওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক ম্যানেজারের উপস্থিতিতে পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে, কিন্তু কোথাও সঠিক গভীরতায় পাইপ দেওয়া হয়নি। অনেক জায়গায় পাইপের নিচে বালু নেই, ফলে বর্ষায় কাদা জমে সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পৌর এলাকার আনুমানিক ২০ কোটি টাকার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও অভিযোগ তুলেছেন, প্রকল্পে যে পাইপ ব্যবহার হচ্ছে তা অত্যন্ত পাতলা ও টেকসই নয়। তাদের আশঙ্কা, কয়েক বছরের মধ্যেই এসব পাইপ মাটির চাপ ও গাড়ির চাকার ওজন সহ্য করতে না পেরে চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।

কালাঘাটার ফরকান বলেন, “এই পাইপগুলো একেবারেই মানহীন। টেকসই হবে না, কয়েক বছরের মধ্যেই ফেটে যাবে।”
ইসলামপুরের জহির উদ্দিন জানান, “আমাদের এলাকায় রাতে পাইপ বসানো হয়। বললে টাকা দিতে বলে, না দিলে চুপ থাকতে বলে।”

চেয়ারম্যান পাড়ার মুজিবুর রশিদ বলেন, “আমরা যখন কাজ বন্ধ করি, তখন উপর থেকে চাপ আসে। কর্তৃপক্ষ জোর করে কাজ চালিয়ে যায়।”

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাইট ম্যানেজার মো. শাহীন দাবি করেন, “দিনে গর্ত করে রাখতে রাখতে রাত হয়ে যায়, তাই রাতে পাইপ বসাতে হয়। পাইপের মান ভালো, এবং যে ক্ষতি হচ্ছে তা কোম্পানি নিজ খরচে মেরামত করবে।”

পাইপের ছবি তুলতে গেলে স্টোরকিপার জাহেদ হোসেন সাংবাদিকদের বাধা দিয়ে বলেন, “ছবি তুলতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।” নিম্নমানের পাইপের কথা স্বীকার করেই তিনি বলেন, “সব জায়গায় কিছু না কিছু অনিয়ম হয়, এখানেও তাই।”

এদিকে পৌর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলো কবে মেরামত হবে—এ বিষয়ে জানতে বান্দরবান পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ুয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে সাংবাদিকদের বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএফএল কোম্পানি ২৫ শতাংশ কম রেটে কাজ নিয়েছে, তাই কিছুটা হেরফের হতেই পারে। তবে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।”

স্থানীয়দের দাবি, “৩৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে এই ধরনের নিম্নমানের কাজ শুধু অপচয় নয়, ভবিষ্যতে পুরো শহরকে দুর্ভোগে ফেলবে।” তারা উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।