
দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পর হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছেন পলাতক সাবেক ডিবি ও এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে থাকা এই কুখ্যাত পুলিশ কর্মকর্তা শুক্রবার নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়ে ফের বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
পোস্টে নিজেকে “সময় অনুযায়ী বদলে ফেলার” অঙ্গীকার করলেও, তার এই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণাকে সাধারণ মানুষ দেখছেন নিছক আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে। বরং সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তব্য ঘিরে ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দেওয়া ওই পোস্টে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর সেনা হেফাজতে থাকার সময় একজন বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। টুপি পরা একটি ছবি শেয়ার করে তিনি লেখেন—
“পাঁচ আগস্ট থেকে সেনা হেফাজতে থাকাকালীন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মোবাইল বন্ধ করে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিদিনই আমার এক বিদেশী বন্ধু ফোন করতেন। তিনি আমার ও আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন ছিলেন। প্রতিদিনই আমাকে মানসিক শক্তি যোগানোর জন্য কিছু পরামর্শ দিতেন। তার মধ্যে একটি ছিল—‘সেই-ই বুদ্ধিমান যে সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলে ফেলে।’ আমিও তাই নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করছি!!!”
তবে তার এই ‘নিজেকে বদলে ফেলা’র ঘোষণাকে অনেকেই দেখছেন অপরাধ থেকে বাঁচার মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মন্তব্যে বলা হচ্ছে—হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গি বানিয়ে সাজানো মামলা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির আত্মশুদ্ধির গল্প জনগণ গ্রহণ করবে না। বদলে যাওয়ার নামে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপুটে ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হলেও, সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের কাছে মনিরুল ইসলাম ‘জঙ্গি নাটকের কারিগর’ নামেই অধিক পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ ও ভয়াবহ।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সরকার যখনই রাজনৈতিক সংকটে পড়ত, তখনই মনিরুল ইসলামের নির্দেশে ‘জঙ্গি আস্তানা’ আবিষ্কারের নাটক সাজানো হতো। উদ্দেশ্য ছিল—গণদৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। বহু ঘটনায় দেখা গেছে, ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে কয়েক মাস গুম করে রাখার পর নির্জন কোনো স্থানে ‘জঙ্গি’ হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
বিরোধী দল দমনে ‘জঙ্গি’ তকমা ব্যবহার ছিল তার অন্যতম প্রধান অস্ত্র। হেফাজত, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক মহলে সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এই কুখ্যাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনেকের মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য মাস্টারমাইন্ডদের একজন ছিলেন তিনি।
এছাড়াও মেধা ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পুলিশে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার প্রত্যক্ষ ভূমিকার ফলে পুলিশ বাহিনী একটি নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে ধীরে ধীরে ‘দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে’ পরিণত হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী শক্তির আন্দোলন দমনে গায়েবি মামলা ও সাজানো অভিযানের নীলনকশা অনেক সময়ই তার টেবিল থেকেই আসত—এমন অভিযোগ বহুদিনের।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 



















