
যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলার নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। অবৈধ মাদক বহনের অভিযোগ করে এসব হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই সব হামলা ছাড়িয়ে শনিবার দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে সরাসরি প্রথম সামরিক হামলা শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
যদিও ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, এমনকি তিনি নিজেকে ২০২৫ সালে যুদ্ধ থামানের জন্য শান্তিতে নোবেল পাওয়ারও যোগ্য মনে করেন। আদৌতে তা কতুটুক যুক্তিযুক্ত?
সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা এসিএএলইডি আল জাজিরাকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন বা বিমান ব্যবহার করে মোট ৬২২টি বোমা হামলা চালিয়েছে অথবা এর অংশীদার ছিল।
এই হামলাগুলো ট্রাম্পের ভোটারদের কাছে দেওয়া বিদেশি সংঘাতে মার্কিন সম্পৃক্ততা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতির বিপরীত। ২০২৫ সালে মোট সাতটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ চালিয়েছে আমেরিকা, যার মধ্যে ৬টিই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
নাইজেরিয়া
খ্রিস্টানদের বড় দিনে উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ার সোকোটো রাজ্যে আইএসআইএলের (আইএসআইএস) সাথে যুক্ত বলে দাবি করে হামলা চালায় ট্রাম্প। উগ্র ডানপন্থি অনেক মার্কিনি এটিকে বড় দিনের উপহার বলে প্রচার করে।
২৫ ডিসেম্বর নাইজেরিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযানের কথা স্বীকার করেছে আবুজা। সেই হামলার বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প খ্রিস্টান সমর্থকদের সন্তুষ্ট করার জন্য এমন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলছে, সেখানকার বিক্ষোভ-সংঘাত কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়।
সোমালিয়া
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সোমালি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং এই অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে আল-কায়েদার সাথে যুক্ত আল-শাবাব, যারা সোমালিয়া ও প্রতিবেশী কেনিয়ায় বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে সোমালিয়া থেকে বেশির ভাগ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, কিন্তু বাইডেন প্রশাসন ২০২২ সালের মে মাসে তাদের পুনরায় মোতায়েন করে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে, সোমালিয়ার তাগিদে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে সক্রিয় রয়েছে। নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ওয়াশিংটন বিমান হামলা তীব্র করেছে সোমালিয়ায়।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে এই বছর কমপক্ষে ১১১টি হামলা রেকর্ড করা হয়েছে, যা জর্জ বুশ, বারাক ওবামা ও জো বাইডেন প্রশাসনের অধীনে সম্মিলিত হামলার সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
সিরিয়া
১৯ ডিসেম্বর সিরিয়ায় ৭০টি আইএসআইএল-ঘাঁটিতে মার্কিন হামলা চালানো হয়। এর এক সপ্তাহ আগে পালমিরায় গুলিতে দুই মার্কিন সেনা এবং একজন বেসামরিক দোভাষী নিহত হন। এর প্রতিশোধে এমন কড়া হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
যদিও কোনো গোষ্ঠীই এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে ট্রাম্প আইএসআইএলকে দোষারোপ করেন।
ট্রাম্প ১৯ ডিসেম্বর ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন, ‘আমি ঘোষণা করছি যে, আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র খুনি-সন্ত্রাসীদের ওপর গুরুতর প্রতিশোধ নিচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সিরিয়ায় আইএসের শক্ত ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে খুব জোরালো আক্রমণ করছি, এটি রক্তে ভেজা একটি জায়গা যেখানে অনেক সমস্যা রয়েছে, কিন্তু আইসিসকে নির্মূল করা গেলে এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’
এর আগে বাইডেন প্রশাসনের অধীনে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মার্কিন সেনা দেশটিতে মোতায়েন ছিল। তখন পেন্টাগন বলেছিল, বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের মধ্যে আইএসআইএলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সংখ্যা সাময়িকভাবে দ্বিগুণ করা হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, সিরিয়ায় সশস্ত্র অপারেটিভদের নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে আমেরিকা ৮০টিরও বেশি অভিযান চালিয়েছে।
সেই সময়, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছিলেন, ‘সিরিয়া আমাদের বন্ধু নয় এবং এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। এটি আমাদের লড়াই নয়।’
ইরান
২০২৫ সালে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তাতে হস্তক্ষেপ করে। ২২ জুন ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এটি ছিল মার্কিন বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীর যৌথ অভিযান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পরে নিশ্চিত করেছিলেন, কিছু স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যদিও পেন্টাগন অনুমান করেছে, এই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে প্রায় দুই বছর পিছিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন হামলার পরদিনই ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। এটি একটি প্রতীকী পদক্ষেপ ছিল, কারণ এই হামলায় কোনো হতাহতে খবর পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে তার বৈঠকের সময় ট্রাম্প আবার ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন।
তিনি পারমাণবিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এখন আমি শুনছি যে ইরান আবারও তাদের পরমাণু কর্মসূচি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে এবং যদি তারা তা করে তাহলে আমাদের তাদের ভেঙে ফেলতে হবে।’
ইয়েমেন
২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের হুথিদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে বিমান ও নৌ হামলা চালিয়েছে। হুথিরা মূলত ইরান-সমর্থিত একটি গোষ্ঠী, যারা ইয়েমেনের জনবহুল উত্তর-পশ্চিমের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, গাজার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে যাতায়াতকারী ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত জাহাজের ওপর হুথিদের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে নতুন ট্রাম্প প্রশাসন রাফ রাইডার নামে একটি অভিযান পরিচালনা করছে। যার অধীনে ইয়েমেনে হুথিদের ওপর হামলাগুলো প্রতিদিনের আক্রমণে পরিণত হয়।
হামলায় অনেক মানুষ মারা গেছে। বন্দর, বিমানবন্দর, রাডার সিস্টেম, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং এমনকি সানা ও হোদেইদার অভিবাসীদের আটক কেন্দ্রসহ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।
ওমানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতির পর গত ৬ মে মার্কিন হামলার সমাপ্তি ঘটে ।
যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০০ হুথিকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন অভিযানের পর এপ্রিল পর্যন্ত ১২৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।
ইরাক
মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অনুসারে, ১৩ মার্চ ইরাকের আল-আনবার প্রদেশে মার্কিন বিমান হামলা শুরু করে, যেখানে একজন হাই-প্রোফাইল আইএস সদস্য নিহত হন।
হামলায় গ্রুপটির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, আবদুল্লাহ ‘আবু খাদিজা’ মাল্লি মুসলিহ আল-রিফাই এবং অপর একজন অজ্ঞাত কর্মী নিহত হন।
সেন্টকম দাবি করেছে, হামলার সময় উভয় ব্যক্তিই অবিস্ফোরিত ‘আত্মঘাতী ভেস্ট’ পরে ছিলেন এবং তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। হামলাগুলো ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছিল এবং উভয়পক্ষই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পরের দিন ট্রুথ সোশ্যালে একটি উদযাপন পোস্টে করেন ট্রাম্প। ট্রাম্প লিখেন, ‘আজ ইরাকে আইসিসের পলাতক নেতা নিহত হয়েছেন।’
ভেনেজুয়েলা
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে শুক্রবার দিবাগত রাতে সামরিক স্থাপনাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে প্রায় একই সাথে বিস্ফোরণ ঘটে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত লা কার্লোতা সামরিক বিমানঘাঁটি এবং ফুয়ের্তে তিউনার প্রধান সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে।
স্ত্রীসহ মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোস্ত্রীসহ মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো
বেশ কিছু এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে এবং শহরের ওপর দিয়ে বিমান উড়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটকের করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আমার দেশ 



















