
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ব্যবসায়ী নুরুল আলমের মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। গ্রেফতারের মাত্র একদিনের মাথায় তার মৃত্যু নিয়ে যখন পরিবার ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের’ অভিযোগ তুলেছে, তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে থানায় তোলা একটি ছবি, যা অজ্ঞাত উপায়ে তার প্রতিপক্ষের ফেসবুক ওয়ালে ছড়িয়ে পড়ে।
নুরুল আলম, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের বাসিন্দা। মঙ্গলবার দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল তাকে আটক করে সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করে। পরে পুলিশ আদালতের মাধ্যমে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার একদিন পর তার মৃত্যু ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনি ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে’ মারা গেছেন। কিন্তু পরিবারের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, নুরুল আলম সুস্থ অবস্থায় আটক হয়েছিলেন। হঠাৎ করে কারাগারে গিয়ে তার মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
এরই মধ্যে সামনে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নুরুল আলমকে থানায় নেওয়ার পর তোলা একটি ছবি কীভাবে গণমাধ্যমে পৌঁছার আগেই প্রতিপক্ষের ফেসবুক ওয়ালে পৌঁছে গেল?
ছবিতে দেখা যায়, পুলিশের হেফাজতে থাকা নুরুল আলম থানার একটি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার পাশে রয়েছেন এক পুলিশ সদস্য। স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, নুরুল আলমকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানোর পরেও এ ঘটনায় থানার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি ছবিটিও গণমাধ্যমকে সরবরাহ করা হয়নি। তাহলে ছবিটি এতো দ্রুত কিভাবে প্রতিপক্ষরা ফেল? তারা কি উদ্দেশ্যে সংবাদপত্রে প্রকাশের আগে ফেসবুকে পোস্ট করলো?
প্রশ্ন উঠেছে, থানার অভ্যন্তরে তোলা কোনো ছবি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে সেটি বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেল কীভাবে? পুলিশের কোনো সদস্য বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তি কি এতে জড়িত ছিলেন? নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছবিটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে?
নুরুল আলমের বড় ভাই নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করে বলেন, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি মহলের পক্ষ ডিবি পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে তার ভাইকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করিয়েছে। তার ভাষ্য, “নুরুল আলমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিচার চাই।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার ভাইকে রাজনৈতিকভাবে যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, অথচ তিনি কখনো যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না; বরং বিএনপির রাজনীতির সমর্থক ছিলেন।
অন্যদিকে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম স্বীকার করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি থানার পক্ষ থেকে কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে সরবরাহ করা হয়নি। তবে ছবিটি কীভাবে বাইরে গেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
এখন প্রশ্ন একটাই—গ্রেফতারের পর থানায় তোলা ছবিটি কার মাধ্যমে ফাঁস হলো? কেনই বা সেটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলো? আর এই ঘটনার সঙ্গে নুরুল আলমের রহস্যজনক মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না?
নুরুল আলমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার। তবে একই সঙ্গে তারা দাবি তুলেছে, শুধু মৃত্যুর ঘটনা নয়, থানা থেকে ছবি ফাঁস হওয়ার উৎসও খুঁজে বের করতে হবে। কারণ এই দুই ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে পুরো ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 
