
চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর ও পরে থানায় নিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গতকাল শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় খুলশী থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই)সহ তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
নাঈম হাসান সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম ফেরার কথা ছিল তাঁর। তবে ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে অটোরিকশাযোগে বাসায় ফেরার পথে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ তাঁর বহনকারী অটোরিকশাটিকে থামার সংকেত দেয়।
নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে অটোরিকশার চালকের কাগজপত্র নিয়ে নেন। পরে তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি পরিচয়পত্রও দেখান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। তাঁর অভিযোগ, খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে তাঁর কোমরে আঘাত করেন।
নাঈম আরও অভিযোগ করেন, পুলিশের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকধারী এক ব্যক্তি, যিনি পুলিশের সোর্স সোহেল নামে পরিচিত, তিনিও পাইপ দিয়ে তাঁকে মারধর করেন।
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার জানান, ঘটনার সময় আশপাশে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয় এবং অনেকেই তাঁর ক্রিকেটার পরিচয় নিশ্চিত করেন। এরপরও মারধর বন্ধ হয়নি। বরং তাঁকে বলা হয়, “তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।”
মারধরের একপর্যায়ে তাঁকে অন্য একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন নাঈম। তাঁর দাবি, পুলিশের গাড়ি উপস্থিত থাকলেও সেখানে তাঁকে তোলা হয়নি। পরে এসআই শফিকুল ইসলাম তাঁকে খুলশী থানায় নিয়ে যান।
নাঈম বলেন, থানায় নেওয়ার পর তাঁকে ওসির কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়েও তিনি হেনস্তার শিকার হন। ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে ওসি তাঁকে বারবার চোখ নিচু করে কথা বলতে বলেন। তবে একটি ফোন পাওয়ার পর ওসির আচরণে পরিবর্তন আসে বলে জানান তিনি।
নাঈম আরও বলেন, অটোরিকশা থেকে নামানোর পর তাঁর মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। থানায় গিয়ে ফোন ফেরত পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালকে বিষয়টি জানান। পরে বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুও বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন।
ঘটনার বিচার দাবি করে নাঈম বলেন, “আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক মানুষ থানায় এসেছে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জন্য হয়তো কেউ আসবে না। আমি চাই, ভবিষ্যতে আর কাউকে যেন এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়।”
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সংশ্লিষ্ট অটোরিকশাটির বিরুদ্ধে চোরাচালানের তথ্য ছিল। তবে তথ্যের সত্যতা এবং অভিযানের আগে প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, পুলিশের অভিযান পরিচালনার নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে কিছু ভুলত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বর্তমানে ছুটিতে থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম একটি তথ্যের ভিত্তিতে এসআই শফিকুল ইসলামকে জানান যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সোনার চোরাচালান হতে পারে। মনিরুল দাবি করেছেন, তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই লালখান বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলম জানান, বিমানবন্দর থেকে নামার পর ছেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। পরে নাঈম ফোন করে পুলিশের মারধরের বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে তিনি থানায় গেলে ডিউটি অফিসার তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে মধ্যরাতে খুলশী থানায় নাঈমের স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরা জড়ো হন। তাঁরা ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশের সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মারধর ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, অভিযানের বিষয়ে এসআই শফিকুল ইসলাম তাঁকে আগে কিছু জানাননি। থানায় আনার পরই তিনি জানতে পারেন যে আটক ব্যক্তি জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। তিনি দাবি করেন, ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত নাঈম ও তাঁর স্বজনরা থানা ত্যাগ করতে রাজি হননি। পরে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়।
ওসি আরও জানান, এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং অভিযানে অংশ নেওয়া আরও এক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড করা হয়েছে।
দেশ বাংলা অনলাইন 
