
শহীদুল ইসলাম বাবর,দেশবাংলা.নেট
চুনতির ঐতিহাসিক ৪৯ তম ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিলে সীরতুন্নবী (সঃ)১০ নভেম্বর রবিবার আরম্ভ হয়ে ২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত মুনাজাতের মাধ্যমে সমাপন করা হবে। মাহফিল পরিচালনা কমিটির পক্ষে মাওলানা আব্দুল মালেক ইবনে দিনার নাজাত এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সূত্রে প্রকাশ, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম চুনতি। গ্রামের নামও চুনতি। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৭৪ কিলোমিটার দক্ষিণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন পাহাড় বেষ্টিত নয়নাভিরাম চুনতি গ্রামের অবস্থান। মহাসড়কের আধ কিলোমিটার পূর্বে আশেকে রসুল(স:) অলিকুল শিরোমণি প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রাহ:) শাহ সাহেব কেবলা চুনতির মাজার, মসজিদে বায়তুল্লাহ ও বিশাল সীরত ময়দান। ১৩ একর আয়তন বিশিষ্ট এ ময়দানে ১৯৭২ সাল থেকে সীরতুন্নবী (স:) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
মাহফিলের গোড়াপত্তন করেন শাহ সাহেব কেবলা চুনতি। এ বারের ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিল ৪৮ তম সীরতুন্নবী (স:) মাহফিল। চুনতি সীরতুন্নবী (স:) মাহফিল ১৯৭৩ সালে ২ দিন, ১৯৭৪ সালে ৩ দিন, ১৯৭৫ সালে ৫ দিন, ১৯৭৬ সালে ১০ দিন, ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে ১২ দিন, ১৯৭৯ সালে ১৭ দিন এবং ১৯৮০ সালে ১৯ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে ১৯ দিন ব্যাপী সীরতুন্নবী (স:) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
মাহফিলে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা থাকে। অত্যন্ত সু-শৃঙ্খলভাবে আগত হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ ও এলাকাবাসী ১৯দিন ব্যাপী সীরত মাহফিলের আহার খেয়ে থাকেন। সীরতুন্নবী(স:)এর বিশাল আয়োজন যেনতেন ব্যাপার নয়। চুনতির মত এতো বড় মাহফিল দেশে বিরল। আর গ্রামে এতো বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান পৃথিবীতে বিরল।
প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রাহ:) শাহ সাহেব কেবলা চুনতি দেশের ইতিহাস প্রসিদ্ধ বুজুর্গানেদ্বীন। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯০৭ সালে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ্ব ছৈয়দ আহমদ (রহ:), মাতার নাম হাজেরা খাতুন। তাঁর পূর্ব পূরুষরা আরব দেশ থেকে চুনতি গ্রামে আসেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ হযরত শাহ আলম খন্দকার আরব দেশ থেকে স্থল পথে দিল্লীতে আসেন।
দিল্লী থেকে নৌপথে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আসেন। সেখান থেকে বাঁশখালী উপজেলার কালিপুর গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র ইব্রাহীম খন্দকার চুনতিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। ৭ বছর বয়সে শাহ সাহেব কেবলার পিতা ইন্তেকাল করেন। পিতামহ আলহাজ্ব মুফতি মাওলানা কাজী ইউছুফ (রহ:) এর পারিবারিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শাহ সাহেব কেবলা প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তার পর চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। পরে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাযিল ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষা জীবনের পর তাঁর দাদার জমিদারী দেখার জন্য তিনি বর্তমান মিয়ানমারের বাম্বু শহরে যান। সেখানকার লোকজন তাঁর এলেম ও আমলে মুদ্ধ হয়ে তাঁকে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম নিয়োগ করেন। কিছুদিন পর ইমামতির কাজ ছেড়ে দিয়ে তিনি পাহাড়-জঙ্গলে, শহরে-বন্দরে, ঝড়-বৃষ্টিতে আল্লাহর জিকির ও হুজুর পাক (স:) এর প্রসংশা করে বেড়াতেন। ৩৭ বছর পর্যন্ত তিনি আল্লাহর জিকির ও হুজুর পাক (স:) এর প্রশংসায় মত্ত ছিলেন।
ঐ সময়ে তিনি বেশি বেশি পড়তেন “হাম মাজারে মুহাম্মদ (স:) পে মর জায়েঙ্গে, জিন্দেগি মে ইয়েহি কাম কর জায়েঙ্গে”। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (স:) এর উদ্দেশ্যে আমার জীবন উৎসর্গিত। সারা জীবন তাঁর ধ্যানে আমি নিয়োজিত থাকব। এ সময়ে মাঝে মধ্যে তিনি চুনতিতেও আসতেন।
২য় মহাযুদ্ধের শেষে তিনি চুনতিতে আসা যাওয়া বাড়িয়ে দেন। তাঁর অনেক কারামতের কথা এখনোও লোকমুখে শুনা যায়। আরকান সড়কের (চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক) গাড়ি চালকদের নিকট তাঁর প্রথম কারামত প্রকাশ পায়। ঐ সময়ে আরকান সড়ক কাঁচা থাকায় চালকদের গাড়ি চলাচলে কষ্ট হত। চালকদের সাহায্যার্থে শাহ সাহেব কেবলা উপস্থিত হতেন। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি চুনতির “ হাজেম মামু” নামে পরিচিতি লাভ করেন।
২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীর গাড়িবহর আরকান সড়কের ঢালায় আটকা পড়েছিল। এমন সময় পাশের গভীর জঙ্গলে মানুষের উপস্থিতি দেখে মিত্র বাহিনী গুলি চালায়। কিছুক্ষণ পর এক লোক কিছু গুলি হাতে নিয়ে গাড়ির নিকট আসল। তখন মেজর তাঁকে সম্মান করে গাড়িতে তুলে নিলেন এবং সিটে বসালেন। লোকটি চালককে গাড়ি চালাতে বললেন। গাড়ি সচল হয়ে গেল। সেই লোকটি হলেন শাহ সাহেব কেবলা। ফলে আরকান সড়কে শাহ সাহেব কেবলা একজন অলি ও দরবেশ হিসেবে পরিচতি লাভ করে।
এ অবস্থায় দিন দিন তার ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগল। ভক্তরা বর্তমান শাহ মঞ্জিলের স্থানে একটি মাটির গুদাম তৈরি করে দেন। শাহ সাহেব কেবলা উপলদ্ধি করেছিলেন আল্লাহ প্রদত্ত ও রসুল (স:) প্রদর্শিত আদর্শ থেকে বিচ্যুতির কারণে মুসলিম সমাজে অধ:পতন। তাই তিনি ১৯৭২ সাল মোতাবেক ১৩৯২ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল সীরতুন্নবী (স:) মাহফিল নামে এক ঐতিহাসিক মাহফিলের সূত্রপাত করেন।
শাহ সাহেব কেবলা জ্যোতির্ময় চেহেরার অধিকারী ছিলেন। আধ্যাত্মিক জগতে তিনি বিচরণ করেছেন। রবিউল আউয়াল মাসে চাঁদ উঠার পর থেকে তিনি বেহাল হয়ে পড়তেন। মাহফিল চলাকালে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতেন। আশ্চর্যের বিষয় যে, মাহফিলের ওয়ায়েজিনগণের উপর অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু আদায় হয়েছে, কি ভুলভ্রান্তি হয়েছে পরবর্তীতে তিনি বলে দিতে পারতেন। এমনকি মাহফিলের কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিতদের ভুলভ্রান্তিও তাঁর নজরে থাকত।
মাহফিলের আখেরি মোনাজাত পর বেশ কিছুদিন তিনি শোকাহত মনে কান্নাজনিত অবস্থায় থাকতেন। তাঁর অনেক কারামত দেখে-শুনে সকলে ভয়ে থাকত। শাহ সাহেব কেবলা ইন্তেকালের পরও আজ পর্যন্ত তার কারামতের ভয়ভীতি মাহফিলের সর্বস্থরের লোকজনের মধ্যে কাজ করে। ফলে ১৯ দিনব্যাপী মাহফিলের লক্ষ লক্ষ মানুষের ব্যবস্থাপনা ও আহারের ঘাটতি আজও পর্যন্ত হয়নি। ১৯ দিনব্যাপী সীরতুন্নবী (স:) মাহফিলের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা দেখে বুঝা যায় হযরত শাহ সাহেব কেবলা (রাহ:) একজন মড় মাপের অলিকুল শিরোমণি ছিলেন।
শাহ সাহেব কেবলা সীরতুন্নবী মাহফিলের ১৯ দিন পূর্বে ২৩ সফর ১৪০৪ হিজরী, ২৯ নভেম্বর ১৯৮৩ সাল সোমবার তিনি ইন্তেকাল করেন। মসজিদে বায়তুল্লার দক্ষিণ পার্শ্বে তিনি চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।
যে কোন প্রয়োজনে মাহফিল পরিচালনা কমিটির সাথে যোগাযোগ-০১৮১৯৮২২৩২৮/ ০১৭৫১৯৬৩৮১৯
দেশ বাংলা ডট নেট ডেস্ক 

























