ঢাকা ০৯:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চলন্ত গাড়ি পানিতে পড়ে গেলে কী করণীয়? জানালেন বুয়েটের অধ্যাপক

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ আগস্ট ভোরে লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী মহাসড়কে একটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালের পানিতে পড়ে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং চারজন নারী রয়েছেন। তাঁরা লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার পশ্চিম চৌপল্লী গ্রামের বাসিন্দা। প্রবাসফেরত একজন আত্মীয়কে আনতে ঢাকা থেকে ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, চালকের ঘুম ঘুম ভাব থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে চালকসহ মোট ১১ জন ছিলেন। দুর্ঘটনার পর চালকসহ চারজন বেরিয়ে এলেও পেছনের সিটে থাকা সাতজন গাড়ির ভেতরে আটকে মারা যান।

এ ঘটনা দেশের আরও কয়েকটি করুণ দুর্ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। যেমন, ২০১৯ সালে পাবনায় একটি প্রাইভেটকার ব্রিজের রেলিং ভেঙে নদীতে পড়ে গেলে পাঁচজন নিহত হন। ২০২১ সালে মুন্সীগঞ্জে খালে গাড়ি পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে পাহাড়ি ছড়ায় গাড়ি পড়ে তিনজন নিহত হন।

এই ধরনের দুর্ঘটনায় বাঁচার জন্য করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, “বেশিরভাগ এয়ারকন্ডিশনযুক্ত লিক-প্রুফ গাড়ি পানিতে পড়লে তা সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায় না। এতে কিছু সময় (৩০ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট) ভেসে থাকার সুযোগ থাকে। সেই সময়টুকুই জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

অধ্যাপক শামসুল হক আরও বলেন, “নন-এসি গাড়ি যেগুলোর জানালা খোলা বা সহজে খোলা যায়, সেগুলো দ্রুত ডুবে গেলেও প্রাণহানি তুলনামূলক কম হয়। কারণ যাত্রীরা জানালা দিয়ে সহজে বের হতে পারেন। অন্যদিকে, এয়ারকন্ডিশনযুক্ত গাড়ির জানালা বন্ধ এবং গ্লাস ভাঙতে না পারার কারণে যাত্রীরা ভেতরে আটকে পড়েন।”

এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা যে চারটি ধাপ মনে রাখার পরামর্শ দেন, তা হলো ‘এসএসডব্লিউজি (SSWG)’:

1. Stay Calm (স্থির থাকুন): আতঙ্ক না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বুঝে নিতে হবে। চিৎকার বা অতিরিক্ত নড়াচড়া অক্সিজেন কমিয়ে দেয়।

2. Seatbelt খুলুন: সিটবেল্ট গলায় বা শরীরে আটকে গেলে বের হতে সমস্যা হয়, তাই দ্রুত এটি খুলে নিতে হবে।

3. Window খুলুন বা ভাঙুন: গাড়ির পাওয়ার উইন্ডো কয়েক সেকেন্ড কাজ করে, তখনই জানালা খুলে বের হতে হবে। দরজা খোলার চেষ্টা না করাই ভালো, কারণ পানির চাপে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

4. Go Out Immediately (তৎক্ষণাৎ বের হয়ে যান): অপেক্ষা না করে জানালা দিয়ে দ্রুত বের হতে হবে এবং অন্যদেরও সহায়তা করতে হবে।

 

যদি পাওয়ার উইন্ডো কাজ না করে, তবে জানালার গ্লাস ভাঙার চেষ্টা করতে হবে। সামনের উইন্ডো সাধারণত নিরাপত্তা গ্লাস হওয়ায় সহজে ভাঙে না, কিন্তু সাইড উইন্ডো বা কর্নার গ্লাস ভাঙা তুলনামূলক সহজ। হেডরেস্টের দণ্ড বা লাইফ হ্যামার দিয়ে গ্লাসের কোণায় আঘাত করতে হয়।

এমন বিপদের সময় গাড়িতে থাকা শিশু বা বৃদ্ধদের আগে সাহায্য করতে হলে, প্রথমে নিজের পাশের জানালা খুলে বাতাস ঢুকতে দিতে হবে, তারপর একজন একজন করে বের করে আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়িতে সবসময় একটি উইন্ডো ব্রেকার বা লাইফ হ্যামার রাখা উচিত। এগুলো ছোট, হালকা ও ব্যবহারযোগ্য—বিপদের সময় জীবন বাঁচাতে পারে।

সবশেষে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়া জানার প্রস্তুতিও জরুরি। মাত্র ৩০ সেকেন্ডে সঠিক সিদ্ধান্তই হতে পারে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

চলন্ত গাড়ি পানিতে পড়ে গেলে কী করণীয়? জানালেন বুয়েটের অধ্যাপক

প্রকাশিত: ০৬:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ অগাস্ট ২০২৫

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ আগস্ট ভোরে লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী মহাসড়কে একটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খালের পানিতে পড়ে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং চারজন নারী রয়েছেন। তাঁরা লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার পশ্চিম চৌপল্লী গ্রামের বাসিন্দা। প্রবাসফেরত একজন আত্মীয়কে আনতে ঢাকা থেকে ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, চালকের ঘুম ঘুম ভাব থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে চালকসহ মোট ১১ জন ছিলেন। দুর্ঘটনার পর চালকসহ চারজন বেরিয়ে এলেও পেছনের সিটে থাকা সাতজন গাড়ির ভেতরে আটকে মারা যান।

এ ঘটনা দেশের আরও কয়েকটি করুণ দুর্ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। যেমন, ২০১৯ সালে পাবনায় একটি প্রাইভেটকার ব্রিজের রেলিং ভেঙে নদীতে পড়ে গেলে পাঁচজন নিহত হন। ২০২১ সালে মুন্সীগঞ্জে খালে গাড়ি পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে পাহাড়ি ছড়ায় গাড়ি পড়ে তিনজন নিহত হন।

এই ধরনের দুর্ঘটনায় বাঁচার জন্য করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, “বেশিরভাগ এয়ারকন্ডিশনযুক্ত লিক-প্রুফ গাড়ি পানিতে পড়লে তা সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায় না। এতে কিছু সময় (৩০ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট) ভেসে থাকার সুযোগ থাকে। সেই সময়টুকুই জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

অধ্যাপক শামসুল হক আরও বলেন, “নন-এসি গাড়ি যেগুলোর জানালা খোলা বা সহজে খোলা যায়, সেগুলো দ্রুত ডুবে গেলেও প্রাণহানি তুলনামূলক কম হয়। কারণ যাত্রীরা জানালা দিয়ে সহজে বের হতে পারেন। অন্যদিকে, এয়ারকন্ডিশনযুক্ত গাড়ির জানালা বন্ধ এবং গ্লাস ভাঙতে না পারার কারণে যাত্রীরা ভেতরে আটকে পড়েন।”

এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা যে চারটি ধাপ মনে রাখার পরামর্শ দেন, তা হলো ‘এসএসডব্লিউজি (SSWG)’:

1. Stay Calm (স্থির থাকুন): আতঙ্ক না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বুঝে নিতে হবে। চিৎকার বা অতিরিক্ত নড়াচড়া অক্সিজেন কমিয়ে দেয়।

2. Seatbelt খুলুন: সিটবেল্ট গলায় বা শরীরে আটকে গেলে বের হতে সমস্যা হয়, তাই দ্রুত এটি খুলে নিতে হবে।

3. Window খুলুন বা ভাঙুন: গাড়ির পাওয়ার উইন্ডো কয়েক সেকেন্ড কাজ করে, তখনই জানালা খুলে বের হতে হবে। দরজা খোলার চেষ্টা না করাই ভালো, কারণ পানির চাপে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

4. Go Out Immediately (তৎক্ষণাৎ বের হয়ে যান): অপেক্ষা না করে জানালা দিয়ে দ্রুত বের হতে হবে এবং অন্যদেরও সহায়তা করতে হবে।

 

যদি পাওয়ার উইন্ডো কাজ না করে, তবে জানালার গ্লাস ভাঙার চেষ্টা করতে হবে। সামনের উইন্ডো সাধারণত নিরাপত্তা গ্লাস হওয়ায় সহজে ভাঙে না, কিন্তু সাইড উইন্ডো বা কর্নার গ্লাস ভাঙা তুলনামূলক সহজ। হেডরেস্টের দণ্ড বা লাইফ হ্যামার দিয়ে গ্লাসের কোণায় আঘাত করতে হয়।

এমন বিপদের সময় গাড়িতে থাকা শিশু বা বৃদ্ধদের আগে সাহায্য করতে হলে, প্রথমে নিজের পাশের জানালা খুলে বাতাস ঢুকতে দিতে হবে, তারপর একজন একজন করে বের করে আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়িতে সবসময় একটি উইন্ডো ব্রেকার বা লাইফ হ্যামার রাখা উচিত। এগুলো ছোট, হালকা ও ব্যবহারযোগ্য—বিপদের সময় জীবন বাঁচাতে পারে।

সবশেষে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়া জানার প্রস্তুতিও জরুরি। মাত্র ৩০ সেকেন্ডে সঠিক সিদ্ধান্তই হতে পারে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান।