ঢাকা ০৯:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী হামলায় র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর আবারও পরিণত হলো রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে। সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের বর্বর হামলায় র‍্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও চারজন র‍্যাব সদস্য ও কর্মকর্তা।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে আসামি গ্রেপ্তারে অভিযানে গিয়ে এই নৃশংস হামলার শিকার হয় চট্টগ্রাম র‍্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল।
নিহত র‍্যাব কর্মকর্তা মো. তওহীদ চট্টগ্রাম র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিজিবি থেকে ডেপুটেশনে র‍্যাবে যোগ দেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আহসান হাবিব পলাশ।

অভিযানের ফাঁদ, আটকে রেখে বেদম প্রহার

চট্টগ্রাম পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সোমবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে র‍্যাবের চার কর্মকর্তা ও সদস্য এবং এক সোর্সকে আটক করে। এরপর তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম হামলা। বেদম মারধরের ফলে গুরুতর আহত হন সবাই।
খবর পেয়ে পুলিশ ও র‍্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মি থাকা সদস্যদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. তওহীদকে মৃত ঘোষণা করেন।

এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি, অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মি থাকা র‍্যাব সদস্যদের উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে এলাকায় পুলিশ ও র‍্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। পুরো এলাকা থমথমে অবস্থায় রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর: রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, র‍্যাব, পুলিশ এমনকি সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকরাও এখানে হামলার শিকার হয়েছেন।
জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। পাহাড়ি দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এলাকাটিতে এখনও সশস্ত্র পাহারায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ।

৩০ হাজার কোটি টাকার জমি দখল, রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই

জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ

গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সবশেষ দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। পরদিন সংবাদ সংগ্রহে গেলে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

আগাম সতর্কতা পেয়ে পাহাড় থেকেই হামলা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম সতর্ক হয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

উন্নয়ন থমকে, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প আটকে

জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা যেখানে থমকে আছে, সেখানে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে পাহাড় দখল করে রক্ত ঝরাচ্ছে—জঙ্গল সলিমপুর এখন সেই নগ্ন বাস্তবতার নাম।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী হামলায় র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত

প্রকাশিত: ০৭:৩০:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর আবারও পরিণত হলো রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে। সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের বর্বর হামলায় র‍্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও চারজন র‍্যাব সদস্য ও কর্মকর্তা।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে আসামি গ্রেপ্তারে অভিযানে গিয়ে এই নৃশংস হামলার শিকার হয় চট্টগ্রাম র‍্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল।
নিহত র‍্যাব কর্মকর্তা মো. তওহীদ চট্টগ্রাম র‍্যাবের উপসহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিজিবি থেকে ডেপুটেশনে র‍্যাবে যোগ দেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আহসান হাবিব পলাশ।

অভিযানের ফাঁদ, আটকে রেখে বেদম প্রহার

চট্টগ্রাম পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সোমবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে র‍্যাবের চার কর্মকর্তা ও সদস্য এবং এক সোর্সকে আটক করে। এরপর তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম হামলা। বেদম মারধরের ফলে গুরুতর আহত হন সবাই।
খবর পেয়ে পুলিশ ও র‍্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মি থাকা সদস্যদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. তওহীদকে মৃত ঘোষণা করেন।

এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি, অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, হামলার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মি থাকা র‍্যাব সদস্যদের উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে এলাকায় পুলিশ ও র‍্যাবের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। পুরো এলাকা থমথমে অবস্থায় রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর: রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র

জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, র‍্যাব, পুলিশ এমনকি সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকরাও এখানে হামলার শিকার হয়েছেন।
জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। পাহাড়ি দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এলাকাটিতে এখনও সশস্ত্র পাহারায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ।

৩০ হাজার কোটি টাকার জমি দখল, রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই

জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ

গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সবশেষ দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। পরদিন সংবাদ সংগ্রহে গেলে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

আগাম সতর্কতা পেয়ে পাহাড় থেকেই হামলা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম সতর্ক হয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

উন্নয়ন থমকে, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প আটকে

জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা যেখানে থমকে আছে, সেখানে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘ্নে পাহাড় দখল করে রক্ত ঝরাচ্ছে—জঙ্গল সলিমপুর এখন সেই নগ্ন বাস্তবতার নাম।