
পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকদের দারিদ্র্য হ্রাস ও বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্যে ২০২২-২০২৩ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কফি ও কাজুবাদাম চাষে ৪১ কোটি ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। তবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে অধিকাংশ অর্থ ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
তথ্যমতে, তিন অর্থবছরে শুধুমাত্র বান্দরবান জেলায় বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের মানসম্মত চারা, সার, বালাইনাশক, পানি সংরক্ষণের ট্যাংক, সেচ সুবিধা, প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কৃষকদের হাতে পৌঁছেছে কিছু নিম্নমানের চারা, সেটিও অসময়ে সরবরাহ হওয়ায় অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। পানির ট্যাংক বরাদ্দ থাকলেও বান্দরবানে ৯২টির মধ্যে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১২টি, তাও রাস্তার পাশে প্রদর্শনের জন্য। এ ছাড়া বাগানের জন্য বরাদ্দ ঘেরাবেড়া বা অবকাঠামো কোথাও দেখা যায়নি।
কৃষকদের ক্ষোভ
সরাসরি কৃষকেরা বলছেন, প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগ্য উন্নয়ন হয়নি বরং তাদের ক্ষতি হয়েছে। বটতলী পাড়ার কৃষক ক্যাসা মারমা জানান, “আমাদের এলাকায় ভেতরের বাগানগুলো কোনো সুযোগ-সুবিধাই পায়নি। শুধু আমার বাগানটি যাতায়াত সুবিধার কারণে কর্তারা বারবার পরিদর্শন করেছেন।”
ময়ুর পাড়ার নারী চাষি মুইক্য চিং মারমা বলেন, “বর্ষা শেষ হওয়ার পর চারা দেওয়া হয়েছিল। পানি ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে চেষ্টা করেও চারাগুলো বাঁচাতে পারিনি।” একই এলাকার আচমং মারমার অভিযোগ, বড় কর্তারা কেবল রাস্তার পাশে কিছু বাগান দেখেই চলে যান।
রোয়াংছড়ির খামচিয়াং ম্রো বলেন, “চারা ছিল ছোট ও নিম্নমানের। লাগানোর কিছুদিনের মধ্যেই মরে গেছে।” আরেক কৃষক মেন পয় ম্রো জানান, “আমরা হাজার টাকার চারাও পাইনি। এখন আবার জুম চাষ করছি।”
মাঠকর্মীর স্বীকারোক্তি
রুমা ও রোয়াংছড়ির দায়িত্বে থাকা মাঠকর্মী অংথুই চিং মারমা জানান, পিডির নির্দেশেই ৯২ ট্যাংকের বদলে ১২টি দেওয়া হয়েছে দৃশ্যমান স্থানে। তিনি বলেন, “স্যার আমাকে যা দিতে বলেছেন, আমি তাই দিয়েছি।”
জনপ্রতিনিধিদের অবস্থান
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। রুমার পাইন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা বলেন, “আমার এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু বাগান আছে, তবে উন্নয়ন বোর্ডের কোনো প্রকল্প চোখে পড়েনি। আগে যেমন বরাদ্দ লোপাট হয়েছে, এবারও একই ঘটনা ঘটেছে।” রোয়াংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লা অং মারমাও একই অভিযোগ করেন।

কৃষি বিভাগের মতামত
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এম.এম শাহ নেয়াজ জানান, প্রচুর জনবল থাকা সত্ত্বেও কৃষি বিভাগ তাদের উৎপাদিত চারা রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। তার মতে, “উন্নয়ন বোর্ড জনবল ছাড়াই কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তা বোধগম্য নয়। জনবল না থাকলে প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন অসম্ভব।”
আত্মপক্ষ সমর্থন
অভিযোগ অস্বীকার না করে প্রকল্প পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, “কিছুটা ত্রুটি হয়েছে, কিছু সুযোগ-সুবিধা সময়ে দেওয়া যায়নি। তাই কিছু টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।” তবে কোন খাত থেকে কত টাকা ফেরত গিয়েছে তা তিনি স্পষ্ট করতে পারেননি। তিনি আরও জানান, সামনে বড় ধরনের নতুন প্রকল্প আসছে, যা বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে।
তদন্তের দাবি
অভিযোগে ক্ষুব্ধ কৃষকরা বলছেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করেও তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। বরং প্রকল্প কর্মকর্তাদের ভাগ্যই বদলেছে। তারা দাবি করেছেন, বর্তমান পিডির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ে কফি ও কাজুবাদাম চাষ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন 



















