ঢাকা ০৩:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এত ক্ষতির পরও লাভের হিসাব!

স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তির সংকটে রয়েছে বিএনপি। এ কারণে দলটির কোনো কোনো নেতা দল ছেড়ে চলে গেছেন।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিকে নিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও ফাটল দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই জোট ভেঙে যেতে পারে বলেও মনে করেন কেউ কেউ। এর পরও বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে রাজি নয়।
এর কারণ জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াতের সারা দেশের বিভিন্ন আসনে নির্ধারিত ভোটব্যাংক আছে। জামায়াতের ভোটের কারণে বিএনপি আসন বেশি পায়।

জামায়াতকে না ছাড়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক ও বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শুধু ভোটব্যাংক আছে তা-ই নয়, জামায়াত রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির কোনো দূরত্ব নেই দাবি করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, গণফোরাম ও নাগরিক ঐক্যের মতো দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনই তার প্রমাণ। ‘বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন যে বক্তব্য রেখেছেন তা তার ব্যক্তিগত মতামত। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে এজাতীয় কোনো বক্তব্য আসেনি।’

তবে জামায়াতের কারণে বিএনপি ভোটে লাভবান হয় এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতের কারণে বিএনপি দেশে-বিদেশে ইমেজ-সংকটে রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাতে পারছে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলটিমেটলি টুডে অর টুমরো জামায়াত বিএনপির সঙ্গে থাকবে না। শহীদ জিয়ার বিএনপিতে জামায়াতের কোনো জায়গা হবে না।’

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট মিলে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করা হয়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে থাকা এই জোট সরকারে জামায়াতের দুই নেতা মন্ত্রী হয়েছিলেন। এ নিয়ে বিএনপিকে এখনো কথা শুনতে হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সাল থেকে দণ্ড কার্যকর শুরুর পর ওই দুই মন্ত্রীসহ পাঁচ জামায়াত নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযুদ্ধে ৫ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক প্রয়াত মীর শওকত আলী জামায়াতের সঙ্গে জোট করার কারণে বিএনপির রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আর বিএনপিতে ফিরে যাননি। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি জামায়াত। তাই তার মৃত্যুর পর তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দলের নেতা-কর্মীরা তার মরদেহ নয়াপল্টনে নিতে চাইলে জামায়াত নেতারা বাধা দেন। তবে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির চাপের কাছে জামায়াত সুবিধা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত মীর শওকতের মরদেহ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়াপল্টনে আনা হয়েছিল।

বিএনপি সমর্থক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রুপ-৯-এর সাধারণ সম্পাদক সায়ন্থ শাখাওয়াৎ তাদের পরিচালিত এক জরিপের বরাত দিয়ে বলেন, বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ৯৫ শতাংশ চায় বিএনপি জামায়াতকে ছাড়ুক। জরিপের ফল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে উপস্থাপন হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে অনেক আসন আছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ভোটের ব্যবধান হয় এক থেকে দেড় হাজারের মতো। ওইসব আসনে জামায়াতের ভোটের কারণে বিএনপির প্রার্থীরা জিতে যায়। এ কারণে বিএনপি জামায়াতকে জোটে রেখেছে। তবে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির আদর্শগত কোনো মিল নেই। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি যেভাবে জামায়াতকে রেখেছে, তেমনিভাবে আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটকে রেখেছে। জোটের ভোটের কারণে আওয়ামী লীগ কোথাও কোথাও জিতে যায়।’

বিএনপির জামায়াত-সঙ্গ নিয়ে সমালোচনাকারী আওয়ামী লীগসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে দুদু বলেন, ‘জামায়াত বিএনপির সঙ্গে থাকার কারণে বিএনপির ভোট কমেছে এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।’

তবে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, বিএনপি জামায়াতকে জোটের রাখার জন্য যে ভোট পায়, তার চেয়ে বেশি ভোট হারায়। বিশেষ করে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ভোট হারাচ্ছে দলটি। ‘এটি বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল।’

তিনি বলেন, ‘জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী ছিলেন তাদেরকে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ফাঁসি দিয়েছে। এখন যারা আছে তাদেরকে একাত্তর সালের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হলেও তারা প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়নি।’সূত্র দেশ রূপান্তর

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

এত ক্ষতির পরও লাভের হিসাব!

প্রকাশিত: ১০:৫৫:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯

স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তির সংকটে রয়েছে বিএনপি। এ কারণে দলটির কোনো কোনো নেতা দল ছেড়ে চলে গেছেন।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিকে নিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও ফাটল দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই জোট ভেঙে যেতে পারে বলেও মনে করেন কেউ কেউ। এর পরও বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে রাজি নয়।
এর কারণ জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াতের সারা দেশের বিভিন্ন আসনে নির্ধারিত ভোটব্যাংক আছে। জামায়াতের ভোটের কারণে বিএনপি আসন বেশি পায়।

জামায়াতকে না ছাড়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক ও বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শুধু ভোটব্যাংক আছে তা-ই নয়, জামায়াত রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির কোনো দূরত্ব নেই দাবি করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, গণফোরাম ও নাগরিক ঐক্যের মতো দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনই তার প্রমাণ। ‘বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন যে বক্তব্য রেখেছেন তা তার ব্যক্তিগত মতামত। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে এজাতীয় কোনো বক্তব্য আসেনি।’

তবে জামায়াতের কারণে বিএনপি ভোটে লাভবান হয় এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতের কারণে বিএনপি দেশে-বিদেশে ইমেজ-সংকটে রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাতে পারছে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলটিমেটলি টুডে অর টুমরো জামায়াত বিএনপির সঙ্গে থাকবে না। শহীদ জিয়ার বিএনপিতে জামায়াতের কোনো জায়গা হবে না।’

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট মিলে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করা হয়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে থাকা এই জোট সরকারে জামায়াতের দুই নেতা মন্ত্রী হয়েছিলেন। এ নিয়ে বিএনপিকে এখনো কথা শুনতে হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সাল থেকে দণ্ড কার্যকর শুরুর পর ওই দুই মন্ত্রীসহ পাঁচ জামায়াত নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযুদ্ধে ৫ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক প্রয়াত মীর শওকত আলী জামায়াতের সঙ্গে জোট করার কারণে বিএনপির রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আর বিএনপিতে ফিরে যাননি। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি জামায়াত। তাই তার মৃত্যুর পর তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দলের নেতা-কর্মীরা তার মরদেহ নয়াপল্টনে নিতে চাইলে জামায়াত নেতারা বাধা দেন। তবে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির চাপের কাছে জামায়াত সুবিধা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত মীর শওকতের মরদেহ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়াপল্টনে আনা হয়েছিল।

বিএনপি সমর্থক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রুপ-৯-এর সাধারণ সম্পাদক সায়ন্থ শাখাওয়াৎ তাদের পরিচালিত এক জরিপের বরাত দিয়ে বলেন, বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ৯৫ শতাংশ চায় বিএনপি জামায়াতকে ছাড়ুক। জরিপের ফল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে উপস্থাপন হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে অনেক আসন আছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ভোটের ব্যবধান হয় এক থেকে দেড় হাজারের মতো। ওইসব আসনে জামায়াতের ভোটের কারণে বিএনপির প্রার্থীরা জিতে যায়। এ কারণে বিএনপি জামায়াতকে জোটে রেখেছে। তবে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির আদর্শগত কোনো মিল নেই। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি যেভাবে জামায়াতকে রেখেছে, তেমনিভাবে আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটকে রেখেছে। জোটের ভোটের কারণে আওয়ামী লীগ কোথাও কোথাও জিতে যায়।’

বিএনপির জামায়াত-সঙ্গ নিয়ে সমালোচনাকারী আওয়ামী লীগসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যে দুদু বলেন, ‘জামায়াত বিএনপির সঙ্গে থাকার কারণে বিএনপির ভোট কমেছে এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।’

তবে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, বিএনপি জামায়াতকে জোটের রাখার জন্য যে ভোট পায়, তার চেয়ে বেশি ভোট হারায়। বিশেষ করে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ভোট হারাচ্ছে দলটি। ‘এটি বিএনপির জন্য একটি বড় ভুল।’

তিনি বলেন, ‘জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী ছিলেন তাদেরকে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ফাঁসি দিয়েছে। এখন যারা আছে তাদেরকে একাত্তর সালের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা হলেও তারা প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়নি।’সূত্র দেশ রূপান্তর