ঢাকা ০৯:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সাতকানিয়ার 'আগস্ট বিস্ফোরণ'

এক দফা দাবিতে উত্তাল হয়েছিল রাজপথ

এক বছর আগের ৪ আগস্ট। ২০২৪ সালের এই দিনটি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় রচিত হয়েছিল এক বিস্ময়কর অধ্যায়। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দমননীতি ও শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ সেদিন ফুঁসে উঠেছিল রাজপথে। ছাত্রদের ডাকে গর্জে উঠেছিল জনতা। কেবল একটি দাবি—সরকার পতনের এক দফা।

এই দিনটি এখন স্থানীয়ভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে “জুলাই দ্রোহের আগস্ট বিস্ফোরণ” নামে। কারণ, এক মাস ধরে সংগঠিত হচ্ছিলো তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার কার্যক্রম, যার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৪ আগস্টে।

আন্দোলনের সূচনা:

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি নেটওয়ার্ক গোপনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ৩ আগস্ট রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে এক ঘোষণা—
“৪ আগস্ট, দুপুর ৩টায় মিঠাদিঘী থেকে কেরানীহাট পর্যন্ত জনগণের পদচারণা হবে।”

পরদিন দুপুরে মিঠাদিঘী এলাকায় জমায়েত হতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, দোকানদার, শিক্ষার্থী—সবাই হাত ধরাধরি করে হাঁটতে শুরু করেন কেরানীহাটের উদ্দেশে। প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কে ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয় মিছিল।

হামলার প্রস্তুতি:

আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা ভিন্ন এক রূপ নেয় যখন কেরানীহাট হক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ আলীর নেতৃত্বে ২০-৩০টি বাইকে মহড়া দিয়ে হুমকি সৃষ্টি করা হয়।

সাংবাদিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরাতন অলকেয়ার হাসপাতালের ছাদ থেকে দেখা যায়, অস্ত্র ভর্তি বস্তা নিয়ে আসা হয়। নিউ মার্কেট এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডাররা সাধারণ পথচারীদের ওপর চড়াও হয়, ছিনতাই করে মোবাইল ও ব্যাগ।

ডাকাত ফারুক, শাহ আলম মেম্বার, পিচ্ছি মিজানসহ সশস্ত্র যুবলীগ ক্যাডাররা মহাসড়কে অবস্থান নেয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো কেরানীহাটে।

গুলির মুখেও থামেনি মিছিল:

ঠিক তখনই, ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল এগিয়ে আসে। স্লোগানে মুখরিত জনতার আওয়াজ—“এক দফা, স্বৈরাচার পতন চাই”—আতঙ্ক ছড়ায় অস্ত্রধারীদের মাঝে। হক টাওয়ার থেকে গুলি ছোঁড়া হলেও মিছিল থেমে যায়নি। বরং বিক্ষোভকারীদের ঢল দেখে ছাত্রলীগ-যুবলীগ পিছু হটে, এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

বিক্ষোভকারীরা হক টাওয়ারের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। আগুনে জ্বালিয়ে দেয় ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল। পুরো কেরানীহাট পরিণত হয় এক উন্মুক্ত গণমঞ্চে, যেখানে রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষ।

প্রশাসনের অনুপস্থিতি:

সেদিন পুলিশের কোনো উপস্থিতি ছিল না—এটা নিয়ে সমালোচনা এখনো থামেনি। একজন স্থানীয় বিশ্লেষক বলেন,
“সকালে কেরানীহাট ছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে, অথচ পুলিশ গায়েব ছিল। প্রশাসনের নিরবতাই আগ্রাসনকে উৎসাহ দিয়েছে।”

এই ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

কেরানীহাটে অস্ত্র কারা এনেছিল?

কারা গুলির নির্দেশ দিয়েছিল?

পুলিশ কেন অনুপস্থিত ছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অজানা।

স্মৃতিতে সেই দিন:

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেছিলেন,
“আমরা ঘরে ফিরব না, যতক্ষণ না স্বৈরাচার পতন হয়। গণভবন কোনো শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সেটা জনগণের ভবন। সময় এসেছে নতুন বাংলাদেশের।”

আজ, এক বছর পর সাতকানিয়ার মানুষ সেই দিনটিকে স্মরণ করে বলেন—“সকালে ভেবেছিলাম কিছুই হবে না, দুপুরে দেখলাম, পুরো এলাকা রাস্তায়।”

উপসংহার:

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কেবল একটি বিক্ষোভের দিন ছিল না। এটি ছিল এক স্বপ্ন, এক সাহসী উচ্চারণ—স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের সরব প্রতিবাদ।

আজও সাতকানিয়ার মানুষ মনে রেখেছে সেই দিনকে। তাদের কণ্ঠে এখনো শোনা যায়—
“আমরা ভুলিনি, ভুলব না—আগস্টের সেই আগুনঝরা দিন।”

 

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

সাতকানিয়ার 'আগস্ট বিস্ফোরণ'

এক দফা দাবিতে উত্তাল হয়েছিল রাজপথ

প্রকাশিত: ০৫:০১:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫

এক বছর আগের ৪ আগস্ট। ২০২৪ সালের এই দিনটি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় রচিত হয়েছিল এক বিস্ময়কর অধ্যায়। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দমননীতি ও শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ সেদিন ফুঁসে উঠেছিল রাজপথে। ছাত্রদের ডাকে গর্জে উঠেছিল জনতা। কেবল একটি দাবি—সরকার পতনের এক দফা।

এই দিনটি এখন স্থানীয়ভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে “জুলাই দ্রোহের আগস্ট বিস্ফোরণ” নামে। কারণ, এক মাস ধরে সংগঠিত হচ্ছিলো তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার কার্যক্রম, যার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৪ আগস্টে।

আন্দোলনের সূচনা:

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি নেটওয়ার্ক গোপনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ৩ আগস্ট রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে এক ঘোষণা—
“৪ আগস্ট, দুপুর ৩টায় মিঠাদিঘী থেকে কেরানীহাট পর্যন্ত জনগণের পদচারণা হবে।”

পরদিন দুপুরে মিঠাদিঘী এলাকায় জমায়েত হতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, দোকানদার, শিক্ষার্থী—সবাই হাত ধরাধরি করে হাঁটতে শুরু করেন কেরানীহাটের উদ্দেশে। প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কে ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয় মিছিল।

হামলার প্রস্তুতি:

আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা ভিন্ন এক রূপ নেয় যখন কেরানীহাট হক টাওয়ারের সামনে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ আলীর নেতৃত্বে ২০-৩০টি বাইকে মহড়া দিয়ে হুমকি সৃষ্টি করা হয়।

সাংবাদিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরাতন অলকেয়ার হাসপাতালের ছাদ থেকে দেখা যায়, অস্ত্র ভর্তি বস্তা নিয়ে আসা হয়। নিউ মার্কেট এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডাররা সাধারণ পথচারীদের ওপর চড়াও হয়, ছিনতাই করে মোবাইল ও ব্যাগ।

ডাকাত ফারুক, শাহ আলম মেম্বার, পিচ্ছি মিজানসহ সশস্ত্র যুবলীগ ক্যাডাররা মহাসড়কে অবস্থান নেয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো কেরানীহাটে।

গুলির মুখেও থামেনি মিছিল:

ঠিক তখনই, ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল এগিয়ে আসে। স্লোগানে মুখরিত জনতার আওয়াজ—“এক দফা, স্বৈরাচার পতন চাই”—আতঙ্ক ছড়ায় অস্ত্রধারীদের মাঝে। হক টাওয়ার থেকে গুলি ছোঁড়া হলেও মিছিল থেমে যায়নি। বরং বিক্ষোভকারীদের ঢল দেখে ছাত্রলীগ-যুবলীগ পিছু হটে, এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

বিক্ষোভকারীরা হক টাওয়ারের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। আগুনে জ্বালিয়ে দেয় ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল। পুরো কেরানীহাট পরিণত হয় এক উন্মুক্ত গণমঞ্চে, যেখানে রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষ।

প্রশাসনের অনুপস্থিতি:

সেদিন পুলিশের কোনো উপস্থিতি ছিল না—এটা নিয়ে সমালোচনা এখনো থামেনি। একজন স্থানীয় বিশ্লেষক বলেন,
“সকালে কেরানীহাট ছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে, অথচ পুলিশ গায়েব ছিল। প্রশাসনের নিরবতাই আগ্রাসনকে উৎসাহ দিয়েছে।”

এই ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

কেরানীহাটে অস্ত্র কারা এনেছিল?

কারা গুলির নির্দেশ দিয়েছিল?

পুলিশ কেন অনুপস্থিত ছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অজানা।

স্মৃতিতে সেই দিন:

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেছিলেন,
“আমরা ঘরে ফিরব না, যতক্ষণ না স্বৈরাচার পতন হয়। গণভবন কোনো শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সেটা জনগণের ভবন। সময় এসেছে নতুন বাংলাদেশের।”

আজ, এক বছর পর সাতকানিয়ার মানুষ সেই দিনটিকে স্মরণ করে বলেন—“সকালে ভেবেছিলাম কিছুই হবে না, দুপুরে দেখলাম, পুরো এলাকা রাস্তায়।”

উপসংহার:

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কেবল একটি বিক্ষোভের দিন ছিল না। এটি ছিল এক স্বপ্ন, এক সাহসী উচ্চারণ—স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের সরব প্রতিবাদ।

আজও সাতকানিয়ার মানুষ মনে রেখেছে সেই দিনকে। তাদের কণ্ঠে এখনো শোনা যায়—
“আমরা ভুলিনি, ভুলব না—আগস্টের সেই আগুনঝরা দিন।”