ঢাকা ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উত্তপ্ত পাহাড় : ১৬ মাসে ৭০ খুন: বাড়ছে আতংক

শহীদুল ইসলাম বাবর, খাগড়াছড়ি থেকে

অশান্ত হয়ে ওঠেছে পাহাড়। একের পর এক পড়ছে লাশ। গত দু’দিনে ৮ জন খুন হয়েছেন। বিগত ১৬ মাসে খুন হয়েছেন ৭০ জন। এনিয়ে পাহাড়ে বিরাজ করছে আতংক। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার রাঙামাটির বিলাইছড়িতে খুন হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। এর আগের দিন সোমবার বাঘাইছড়িতে খুন হন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ৭ ব্যক্তি। বাঘাইছড়ির ঘটনায় গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বাঘাইছড়ির হত্যাকান্ড পূর্বপরিকল্পিত। খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক বলেছেন, পাহাড়ে দ্রুত চিরুনি অভিযান চালানো হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যৌথবাহিনী কাজ করবে। পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। অপরদিকে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বুধবার চলছে খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়েছে।
জানা যায়,১৯ মার্চ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আলিখিয়ং এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এর আগের দিন বাঘাইছড়িতে উপজেলা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে ফেরার পথে দায়িত্ব পালনকারীদের উপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করা হয় । পর পর এমন পাহাড়ে বাড়ছে উত্তেজনা। পাহাড়ে বিবাদমান পক্ষগুলোর একটি জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-এমএন লারমা) এই হামলার জন্য জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। তবে এতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন সন্তু লারমার দলের নেতারা।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সন্তু লারমার দল জেএসএসের বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, এই ঘটনার সাথে আমাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। ওই এলাকায় আমাদের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বা অবস্থানও নেই। ওটা পুরোটাই ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকা।
সূত্র জানায়, গত ১৬ মাস অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ফের অশান্ত হয়ে পড়ে পাহাড়। একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে। এ ১৬ মাসে অন্তত ৭০ জন খুন হয়েছেন। পাহাড়ের দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক দলগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব হামলার ঘটনা মূলত তিনটি আঞ্চলিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এগুলো হচ্ছে ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এবং জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। এই তিনটি দলের মধ্যে এক পক্ষে ইউপিডিএফ এবং আরেক পক্ষে রয়েছে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। একবার এক বা দুই দলের কেউ আক্রান্ত হলে পরেরবার তাদের প্রতিপক্ষের কেউ হামলার শিকার হচ্ছে। তবে কোনো পক্ষই ঘটনার দায় স্বীকার করে না। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় হতাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষও। তবে এবার আঞ্চলিক দলগুলোর বাইরে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সাধারণ মানুষ।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চুক্তির পর চুক্তির বিরোধিতা করে জন্ম নেয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সেই থেকে দুই দলের বিরোধে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘাতে মারা গেছে প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী। কিন্তু ২০১৬ সালে দুই দলের মধ্যে অলিখিত ও অপ্রকাশ্য এক চুক্তির ফলে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ হয়। ফলে স্বস্তির বাতাস নেমে আসে পাহাড়ে। তবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ এনে ‘পাহাড়ে আবার আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন।
কাকতালীয়ভাবে তাঁর এ ঘোষণার মাত্র দুই দিন পর ৫ ডিসেম্বর অনাধি রঞ্জন চাকমা (৫৫) নামের এক ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্যকে হত্যা করা হয়। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিককে দায়ী করে ইউপিডিএফ।
একই দিন রাঙামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গায় ইউপিডিএফের কর্মী ও সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ এ হত্যাকান্ডের জন্য নতুন ইউপিডিএফকে দায়ী করে।
৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল। একই দিন খাগড়াছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের অন্যতম নেতা মিঠুন চাকমাকে। ইউপিডিএফ এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক দলকে দায়ী করেছে।
৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেওয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনার জন্য সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ। ২১ ফেব্রæয়ারি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সুভাষ চাকমা নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনিও ইউপিডিএফের কর্মী ছিলেন।
১৭ ফেব্রæয়ারি খাগড়াছড়ি শহরের হরিনাথপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফের কর্মী দিলীপ কুমার চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের কর্মী নতুন মনি চাকমাকে। ওই দিন রাতে নিজ বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নতুন মনি চাকমাকে হত্যা করা হয়। ১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান তিনজন। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) এক সদস্যকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জনসংহতি সমিতিরও (এম এন লারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় সূর্য বিকাশ চাকমা নামের একজন নিহত হন। ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা (৪০) নামের এক ইউপিডিএফ নেতা নিহত হন। ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনের সময় গুলি করে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এর একদিন পরই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনয় চাকমা এবং গাড়িচালক সজীব।
চলতি সালের ১৪ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড়ে জেএসএস (এমএন লারমা) এর নেতা মোহন ত্রিপুরা হত্যাকাÐের রেশ না কাটতেই খুন হন ইউপিডিএফ এর সাবেক কর্মী পিপলু ত্রিপুরা (রনি)। এর আগে ৪ জানুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে এক জেএসএস (এমএন লারমা) নেতা বসু চাকমাকে খুন করা হয়। এছাড়া ২৯ জানুয়ারি রাঙামাটির লংগদুতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে পবিত্র চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ নেতা নিহত হন। গত ১৫ মার্চ খাগড়াছড়ির পানছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে ইউপিডিএফকর্মী বিনাশন চাকমা নিহত হয়। সাংগঠনিক কাজে গণসংযোগ করার সময় তাকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। ৭ মার্চ রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে চিক্কোধন নামে এক ইউপিডিএফ (প্রসীত) নেতাকে খুন করা হয়। ২০১৮ সালে ২৪ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির পানছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুইজন প্রাণ হারান। ১৮ আগস্ট খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর এলাকায় ৬ জন এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে কেঙ্গালছড়ি এলাকায় ব্রাশফায়ারে ৫ জন মারা যায়।
পাহাড়ে এমন পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ওই অঞ্চলে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়, এটা দীর্ঘদিনের পুরনো। এটা যেমন নিছক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দুটি দলের অন্তঃকোন্দল। তেমনি নিজেদের ভেতর আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিও বড় একটি কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে চাঁদাবাজির বিষয়টিও। আর পুরো বিষয়ের ভেতর দিয়ে সরকারের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির উদ্যোগকে অকার্যকর বা বাধাগ্রস্ত করার অপকৌশলও আছে। কারণ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে অনৈতিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি, জমি নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো খর্ব হবে। তিনি বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর যে দুটি দল সক্রিয় রয়েছে, তাদের মধ্যেই মূলত সমস্যা হচ্ছে। একে অন্যের বিরুদ্ধে সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে।
একের পর এক খুনের ঘটনায় পাহাড়ের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আতংক বিরাজ করছে পুরো পাহাড়ি এলাকা জুড়ে।
অপরদিকে খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক বলেছেন, উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস ঘটনা খুবই দুঃখজনক। পাহাড়ে দ্রুত চিরুনি অভিযান চালানো হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যৌথবাহিনী কাজ করবে। পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। তিনি গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের একথা বলেন।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

উত্তপ্ত পাহাড় : ১৬ মাসে ৭০ খুন: বাড়ছে আতংক

প্রকাশিত: ০৮:১৮:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯

শহীদুল ইসলাম বাবর, খাগড়াছড়ি থেকে

অশান্ত হয়ে ওঠেছে পাহাড়। একের পর এক পড়ছে লাশ। গত দু’দিনে ৮ জন খুন হয়েছেন। বিগত ১৬ মাসে খুন হয়েছেন ৭০ জন। এনিয়ে পাহাড়ে বিরাজ করছে আতংক। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার রাঙামাটির বিলাইছড়িতে খুন হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। এর আগের দিন সোমবার বাঘাইছড়িতে খুন হন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ৭ ব্যক্তি। বাঘাইছড়ির ঘটনায় গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বাঘাইছড়ির হত্যাকান্ড পূর্বপরিকল্পিত। খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক বলেছেন, পাহাড়ে দ্রুত চিরুনি অভিযান চালানো হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যৌথবাহিনী কাজ করবে। পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। অপরদিকে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বুধবার চলছে খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়েছে।
জানা যায়,১৯ মার্চ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আলিখিয়ং এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এর আগের দিন বাঘাইছড়িতে উপজেলা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে ফেরার পথে দায়িত্ব পালনকারীদের উপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করা হয় । পর পর এমন পাহাড়ে বাড়ছে উত্তেজনা। পাহাড়ে বিবাদমান পক্ষগুলোর একটি জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-এমএন লারমা) এই হামলার জন্য জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। তবে এতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন সন্তু লারমার দলের নেতারা।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সন্তু লারমার দল জেএসএসের বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, এই ঘটনার সাথে আমাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। ওই এলাকায় আমাদের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বা অবস্থানও নেই। ওটা পুরোটাই ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকা।
সূত্র জানায়, গত ১৬ মাস অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ফের অশান্ত হয়ে পড়ে পাহাড়। একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে। এ ১৬ মাসে অন্তত ৭০ জন খুন হয়েছেন। পাহাড়ের দুই জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক দলগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব হামলার ঘটনা মূলত তিনটি আঞ্চলিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এগুলো হচ্ছে ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এবং জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। এই তিনটি দলের মধ্যে এক পক্ষে ইউপিডিএফ এবং আরেক পক্ষে রয়েছে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। একবার এক বা দুই দলের কেউ আক্রান্ত হলে পরেরবার তাদের প্রতিপক্ষের কেউ হামলার শিকার হচ্ছে। তবে কোনো পক্ষই ঘটনার দায় স্বীকার করে না। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় হতাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষও। তবে এবার আঞ্চলিক দলগুলোর বাইরে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সাধারণ মানুষ।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চুক্তির পর চুক্তির বিরোধিতা করে জন্ম নেয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সেই থেকে দুই দলের বিরোধে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘাতে মারা গেছে প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী। কিন্তু ২০১৬ সালে দুই দলের মধ্যে অলিখিত ও অপ্রকাশ্য এক চুক্তির ফলে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ হয়। ফলে স্বস্তির বাতাস নেমে আসে পাহাড়ে। তবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ এনে ‘পাহাড়ে আবার আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন।
কাকতালীয়ভাবে তাঁর এ ঘোষণার মাত্র দুই দিন পর ৫ ডিসেম্বর অনাধি রঞ্জন চাকমা (৫৫) নামের এক ইউপিডিএফ সমর্থক ইউপি সদস্যকে হত্যা করা হয়। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিককে দায়ী করে ইউপিডিএফ।
একই দিন রাঙামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গায় ইউপিডিএফের কর্মী ও সংগঠক অনল বিকাশ চাকমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইউপিডিএফ এ হত্যাকান্ডের জন্য নতুন ইউপিডিএফকে দায়ী করে।
৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল। একই দিন খাগড়াছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের অন্যতম নেতা মিঠুন চাকমাকে। ইউপিডিএফ এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক দলকে দায়ী করেছে।
৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেওয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনার জন্য সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ। ২১ ফেব্রæয়ারি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সুভাষ চাকমা নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনিও ইউপিডিএফের কর্মী ছিলেন।
১৭ ফেব্রæয়ারি খাগড়াছড়ি শহরের হরিনাথপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফের কর্মী দিলীপ কুমার চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের কর্মী নতুন মনি চাকমাকে। ওই দিন রাতে নিজ বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নতুন মনি চাকমাকে হত্যা করা হয়। ১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান তিনজন। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) এক সদস্যকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জনসংহতি সমিতিরও (এম এন লারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের পেরাছড়া এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় সূর্য বিকাশ চাকমা নামের একজন নিহত হন। ২২ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় সুনীল বিকাশ ত্রিপুরা (৪০) নামের এক ইউপিডিএফ নেতা নিহত হন। ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনের সময় গুলি করে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এর একদিন পরই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনয় চাকমা এবং গাড়িচালক সজীব।
চলতি সালের ১৪ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড়ে জেএসএস (এমএন লারমা) এর নেতা মোহন ত্রিপুরা হত্যাকাÐের রেশ না কাটতেই খুন হন ইউপিডিএফ এর সাবেক কর্মী পিপলু ত্রিপুরা (রনি)। এর আগে ৪ জানুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে এক জেএসএস (এমএন লারমা) নেতা বসু চাকমাকে খুন করা হয়। এছাড়া ২৯ জানুয়ারি রাঙামাটির লংগদুতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে পবিত্র চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ নেতা নিহত হন। গত ১৫ মার্চ খাগড়াছড়ির পানছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে ইউপিডিএফকর্মী বিনাশন চাকমা নিহত হয়। সাংগঠনিক কাজে গণসংযোগ করার সময় তাকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। ৭ মার্চ রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে চিক্কোধন নামে এক ইউপিডিএফ (প্রসীত) নেতাকে খুন করা হয়। ২০১৮ সালে ২৪ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির পানছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুইজন প্রাণ হারান। ১৮ আগস্ট খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর এলাকায় ৬ জন এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে কেঙ্গালছড়ি এলাকায় ব্রাশফায়ারে ৫ জন মারা যায়।
পাহাড়ে এমন পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ওই অঞ্চলে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়, এটা দীর্ঘদিনের পুরনো। এটা যেমন নিছক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দুটি দলের অন্তঃকোন্দল। তেমনি নিজেদের ভেতর আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টিও বড় একটি কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে চাঁদাবাজির বিষয়টিও। আর পুরো বিষয়ের ভেতর দিয়ে সরকারের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির উদ্যোগকে অকার্যকর বা বাধাগ্রস্ত করার অপকৌশলও আছে। কারণ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে অনৈতিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি, জমি নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো খর্ব হবে। তিনি বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর যে দুটি দল সক্রিয় রয়েছে, তাদের মধ্যেই মূলত সমস্যা হচ্ছে। একে অন্যের বিরুদ্ধে সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে।
একের পর এক খুনের ঘটনায় পাহাড়ের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আতংক বিরাজ করছে পুরো পাহাড়ি এলাকা জুড়ে।
অপরদিকে খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক বলেছেন, উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস ঘটনা খুবই দুঃখজনক। পাহাড়ে দ্রুত চিরুনি অভিযান চালানো হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যৌথবাহিনী কাজ করবে। পাহাড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। তিনি গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের একথা বলেন।