
সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এবার প্রযুক্তির সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেল ইরান। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশটির কর্তৃপক্ষ ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও কার্যত অচল করে দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর অত্যাধুনিক জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বন্ধ করায় দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট
ইরানি সংবাদমাধ্যম ইরান ওয়ার জানিয়েছে, জাতীয় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হওয়ার তিন দিন পার হলেও এখনও ইরান পুরোপুরি ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, এমনকি ফোন কল—সবই প্রায় অচল। শেষ ভরসা হিসেবে বিবেচিত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিক্ষোভকারী ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে ইরানে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ছিল অঞ্চলভিত্তিক ও আংশিক। কিন্তু চলমান দেশব্যাপী বিক্ষোভের মুখে এবার আন্তর্জাতিক ও দেশীয়—সব ধরনের নেটওয়ার্ক একযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও সরাসরি টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
কেন অচল স্টারলিংক?
ইরানি ইন্টারনেট গবেষক আমির রশিদির দাবি, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই স্টারলিংক স্যাটেলাইট লক্ষ্য করে সামরিক মানের জ্যামিং সিগন্যাল শনাক্ত করা গেছে। শুরুতে প্রায় ৩০ শতাংশ সংযোগ ব্যাহত হলেও রাত ১০টার পর তা ৮০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়।
রশিদি বলেন, দুই দশকের গবেষণাজীবনে তিনি এমন শক্তিশালী জ্যামিং কখনো দেখেননি। প্রযুক্তিটি এতটাই উন্নত যে এটি রাশিয়া বা চীনের সহায়তায় সরবরাহকৃত, অথবা ইরান নিজেই তৈরি করেছে—এমন ধারণাও উঠে এসেছে।
ইরানে কতজন ব্যবহার করতেন স্টারলিংক?
ধারণা করা হয়, ইরানে স্টারলিংকের ব্যবহারকারী সংখ্যা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় দীর্ঘ ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও অনেকেই এই সেবা সচল রাখতে পেরেছিলেন। তবে এবারের জ্যামিং সেই সক্ষমতাকেও হার মানিয়েছে।
ফোন, অ্যাপ, ব্যাংকিং—সব বন্ধ
রোববার রাত ১০টার পর মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু এলাকায় বাসাবাড়ির ওয়াই-ফাই সাময়িকভাবে চালু থাকলেও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় তা কার্যত অকেজো।
ব্যাংকিং সেবা, রাইড শেয়ারিং অ্যাপ (স্ন্যাপ, তাপসি), অনলাইন কেনাকাটা, এমনকি দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোন কলও ব্লক করা হয়েছে।
কবে ফিরবে সংযোগ?
২০১৯ সালের নভেম্বরের ১২ দিনের ব্ল্যাকআউটের সঙ্গে তুলনা করে আমির রশিদি বলেন, এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কারণ এবার শুধু মোবাইল ও দেশীয় সেবা নয়, স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে—যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
‘হোয়াইট লিস্ট’ ও ডিজিটাল বৈষম্য
ব্ল্যাকআউটের পরদিন থেকেই সরকার ‘হোয়াইট লিস্ট’ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর আওতায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান ও নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টকে সীমিত ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারঘনিষ্ঠ টেলিগ্রাম চ্যানেল, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে অনলাইনে ফিরছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে ইরানে ইন্টারনেট ক্রমেই বিশেষাধিকারভিত্তিক হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের আস্থাভাজনরা সংযোগ পেলেও সাধারণ মানুষ তথ্য ও যোগাযোগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
সূত্র: ইরান ওয়ার, ফোর্বস
দেশ বাংলা অনলাইন 

























