
দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ টিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দুপুরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে উভয় পক্ষ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের চিফ অবজার্ভার ইভারস আইজাবস, পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট মার্সেল নাগি এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট ভিওনিয়া মাদালিনা।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি দলে ছিলেন সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশীদ, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাশরাফি সরকার, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম এবং নারী বিষয়ক সেল সম্পাদক নোভা।
বৈঠকে বিশেষভাবে আসন্ন নির্বাচন প্রক্রিয়া, জুলাই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও এর প্রভাব নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিনিময় হয়।
বৈঠক শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা জানতে চেয়েছেন—বাংলাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ বর্তমানে কেমন, প্রশাসন কী ভূমিকা পালন করছে এবং তারা নিরপেক্ষ রয়েছে কি না।
তিনি জানান, আলোচনায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়।
হাসিব আল ইসলাম বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি—বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য এই মুহূর্তে নির্বাচন প্রয়োজন। তবে সার্বিকভাবে দেশে একটি গুরুতর নিরাপত্তা সংকট বিদ্যমান।”
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করে টার্গেটেড কিলিংয়ের সঙ্গে জড়িত। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনা এবং কারওয়ান বাজারে বিএনপি নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও তাদের গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসন মূলত বিএনপি ও জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, ফলে ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্বাচনী সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বড় দলগুলো তুলনামূলকভাবে প্রশাসনিক সুবিধা পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন সম্পর্কেও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসিব বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। বিএনপির কয়েকজন নেতার ঋণখেলাপি থাকা সত্ত্বেও তাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীদের সামান্য কাগজপত্রের ঘাটতির কারণেই মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে।”
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে হাসিব আল ইসলাম বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি—আওয়ামী লীগ বর্তমানে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। তারা টার্গেটেড কিলিংয়ের সঙ্গে জড়িত এবং ২০১৩ সালের গণহত্যা ও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।”
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় এখনো জনগণ বিচার পায়নি এবং দলটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত নয়। “বাংলাদেশের মানুষ এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ চায় না”—এই বার্তাই ইইউ প্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের বিচার অগ্রগতি নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানান হাসিব। তিনি বলেন, “যত দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এগোবে, ততই দেশের জন্য মঙ্গল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আর কোনো প্রয়োজন নেই—এটাই আমরা স্পষ্ট করেছি।”
বৈঠক প্রসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশীদ বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কী ধরনের সংকট ও সমস্যা দেখা দিতে পারে, সে বিষয়েও ইইউ প্রতিনিধিরা জানতে চেয়েছেন।
তিনি জানান, আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে মব ভায়োলেন্স, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া এবং নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
রিফাত রশীদ বলেন, “ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি এবং তাদের জোট নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী—তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।”
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচন তো দূরের কথা, বাংলাদেশের রাজনীতিতেই আমরা আওয়ামী লীগকে দেখতে চাই না। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে নির্বাচনে সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও আমরা উদ্বেগ জানিয়েছি। আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন; তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।”
জাতীয় পার্টি সম্পর্কে রিফাত রশীদ বলেন, দলটি আওয়ামী লীগের অর্থায়নে পরিচালিত এবং তাদের রাজনীতি বহন করছে। “আমরা জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে না রাখার পক্ষে। তবে যদি রাখা হয়, তাহলে অবশ্যই বিচার ও রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে তাদের নির্বাচনে আসতে হবে,”—বলেন তিনি।
দেশ বাংলা অনলাইন 



















