ঢাকা ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ঘুষের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন শাহজাহান আক্তার

আধুনগর ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া অচল সেবা

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আধুনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন এখন ঘুষের এক অভয়ারণ্য—এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের মুখে মুখে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তারের অধীনে এই অফিসে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। নামজারি থেকে শুরু করে খতিয়ান সংশোধন, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়—প্রতিটি ধাপেই যেন ঘুষ এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে সেবা নিতে গেলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয় “কত দিতে পারবেন?” এরপর নির্ধারণ হয় ফাইলের গতি। টাকা না দিলে দিনের পর দিন, কখনো মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা, এমনকি গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রবাসী ও দূরবর্তী এলাকার সেবাগ্রহীতারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি নামজারি প্রস্তাবের জন্য দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। খতিয়ান সংশোধন কিংবা অনলাইন এন্ট্রি সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও আলাদা করে ‘দর’ নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে অফিসের ভেতরের ও বাইরের কয়েকজন ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে জড়িত।

আধুনগরের রূপবান পাড়ার বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী মুহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন,
আধুনগর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তারকে টাকা দিলেই ফাইল নড়ে। এটা আমি নিজেই ভুক্তভোগী। আমার একটি নামজারী আবেদন টাকা না দেওয়ায় দুই বার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তার গায়েব করে ফেলেছেন। কাগজপত্র সব বৈধ থাকার পরেও তিনি প্রস্তাব না পাঠিয়ে নথি গায়েব করে রেখেছিলেন। পরে পুনরায় তৃতীয় বার আবেদন করে আমার নিকট আত্মীয় সাংবাদিক নিয়ে গিয়ে প্রস্তাব ফাইলটি আনতে হয়েছে। তাকে টাকা না দেওয়ায় আমাকে কয়েক মাস হয়রানি করেছেন ভূমি কর্মকর্তা।

লোহাগাড়া সদরের বাসিন্দা মনজুরুর রহমান চৌধুরীর অভিযোগ আরও স্পষ্ট। তিনি ছয়টি খতিয়ান অনলাইনে এন্ট্রি করলেও সমন্বয়ের নামে তাঁর কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁর কাজ এখনো ঝুলে আছে। একইভাবে মনছুর নামে আরেক ভুক্তভোগী জানান, খাজনার একটি অনলাইন রশিদ পেতে তাঁকে চার হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
শুধু সেবা প্রদানেই নয়, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ক্ষেত্রে প্রকৃত করের পরিমাণ গোপন রেখে কম টাকা আদায় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো—একই জমি একাধিকবার নামজারি করার ঘটনা। আমতলী মৌজার একটি খতিয়ানে জমি না থাকা সত্ত্বেও নতুন করে নামজারি খোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা সরাসরি জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তার। তাঁর দাবি, “অনেকে অবৈধ কাগজপত্র নিয়ে এসে সেবা নিতে চান। নিয়ম অনুযায়ী কাজ না হলে তারা উল্টো আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলেন।দালালদের আবেদনগুলো কিভাবে সহজে হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দালালদের বিরুদ্ধে আপনারা লেখালেখি করেন‌। আমি দালালদের কোনো ভাবেই সুযোগ দিচ্ছি না।”

এ বিষয়ে লোহাগাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন সাংবাদিকদের বলেন, “অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—লিখিত অভিযোগ ছাড়া কি এই প্রকাশ্য অনিয়ম চোখে পড়ে না? বছরের পর বছর ধরে একই অভিযোগ উঠলেও কেন নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর পদক্ষেপ?
সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় আধুনগর ভূমি অফিস দুর্নীতির এই চক্র থেকে কখনোই মুক্ত হবে না, আর সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কেবলই বাড়তে থাকবে।

ট্যাগ:
রিপোর্টার এর তথ্য

সমাজসেবায় অবদানের জন্য ‘মাদার তেরেসা পিস অ্যাওয়ার্ড মনোনীত হলেন চুনতির কৃতি সন্তান কফিল উদ্দিন লিটু

ঘুষের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন শাহজাহান আক্তার

আধুনগর ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া অচল সেবা

প্রকাশিত: ০৭:২২:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আধুনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন এখন ঘুষের এক অভয়ারণ্য—এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের মুখে মুখে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তারের অধীনে এই অফিসে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। নামজারি থেকে শুরু করে খতিয়ান সংশোধন, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়—প্রতিটি ধাপেই যেন ঘুষ এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে সেবা নিতে গেলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয় “কত দিতে পারবেন?” এরপর নির্ধারণ হয় ফাইলের গতি। টাকা না দিলে দিনের পর দিন, কখনো মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা, এমনকি গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রবাসী ও দূরবর্তী এলাকার সেবাগ্রহীতারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি নামজারি প্রস্তাবের জন্য দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। খতিয়ান সংশোধন কিংবা অনলাইন এন্ট্রি সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও আলাদা করে ‘দর’ নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে অফিসের ভেতরের ও বাইরের কয়েকজন ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে জড়িত।

আধুনগরের রূপবান পাড়ার বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী মুহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন,
আধুনগর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তারকে টাকা দিলেই ফাইল নড়ে। এটা আমি নিজেই ভুক্তভোগী। আমার একটি নামজারী আবেদন টাকা না দেওয়ায় দুই বার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তার গায়েব করে ফেলেছেন। কাগজপত্র সব বৈধ থাকার পরেও তিনি প্রস্তাব না পাঠিয়ে নথি গায়েব করে রেখেছিলেন। পরে পুনরায় তৃতীয় বার আবেদন করে আমার নিকট আত্মীয় সাংবাদিক নিয়ে গিয়ে প্রস্তাব ফাইলটি আনতে হয়েছে। তাকে টাকা না দেওয়ায় আমাকে কয়েক মাস হয়রানি করেছেন ভূমি কর্মকর্তা।

লোহাগাড়া সদরের বাসিন্দা মনজুরুর রহমান চৌধুরীর অভিযোগ আরও স্পষ্ট। তিনি ছয়টি খতিয়ান অনলাইনে এন্ট্রি করলেও সমন্বয়ের নামে তাঁর কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁর কাজ এখনো ঝুলে আছে। একইভাবে মনছুর নামে আরেক ভুক্তভোগী জানান, খাজনার একটি অনলাইন রশিদ পেতে তাঁকে চার হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
শুধু সেবা প্রদানেই নয়, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ক্ষেত্রে প্রকৃত করের পরিমাণ গোপন রেখে কম টাকা আদায় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো—একই জমি একাধিকবার নামজারি করার ঘটনা। আমতলী মৌজার একটি খতিয়ানে জমি না থাকা সত্ত্বেও নতুন করে নামজারি খোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা সরাসরি জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহজাহান আক্তার। তাঁর দাবি, “অনেকে অবৈধ কাগজপত্র নিয়ে এসে সেবা নিতে চান। নিয়ম অনুযায়ী কাজ না হলে তারা উল্টো আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলেন।দালালদের আবেদনগুলো কিভাবে সহজে হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দালালদের বিরুদ্ধে আপনারা লেখালেখি করেন‌। আমি দালালদের কোনো ভাবেই সুযোগ দিচ্ছি না।”

এ বিষয়ে লোহাগাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন সাংবাদিকদের বলেন, “অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—লিখিত অভিযোগ ছাড়া কি এই প্রকাশ্য অনিয়ম চোখে পড়ে না? বছরের পর বছর ধরে একই অভিযোগ উঠলেও কেন নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর পদক্ষেপ?
সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় আধুনগর ভূমি অফিস দুর্নীতির এই চক্র থেকে কখনোই মুক্ত হবে না, আর সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কেবলই বাড়তে থাকবে।