
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ‘ডিএইচ-৬৯’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য শোডাউন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ‘আতঙ্কের নাম’ হিসেবে প্রচার এবং অস্ত্রসদৃশ বস্তু প্রদর্শনের অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি কেরানীহাট এলাকায় লাল রঙের পতাকা হাতে কয়েক ডজন কিশোর-তরুণের মহাসড়কে শক্তি প্রদর্শনের ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন আগে কেরানীহাটের সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টের সামনে জড়ো হন
ডিএইচ-৬৯ নামধারী একটি গ্রুপের সদস্যরা। পরে একটি বড় লাল পতাকা হাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে মিছিল ও শোডাউন করতে দেখা যায় তাদের। পতাকাটিতে বড় অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘ডিএইচ-৬৯’।
শোডাউনের সময় ধারণ করা ভিডিও ও ছবি পরবর্তীতে ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব পোস্টের কয়েকটিতে ‘আতঙ্কের নাম ডিএইচ-৬৯’ লেখা ক্যাপশন ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচি বা কোনো সামাজিক আয়োজন ছাড়া এত সংখ্যক কিশোর-তরুণকে একই ব্যানারে প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন করতে দেখা যায় না। ফলে ঘটনাটি অনেকের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি শঙ্কারও জন্ম দিয়েছে।
কেরানীহাটের এক ব্যবসায়ী বলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো সংগঠনের অনুষ্ঠান। পরে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও দেখে বুঝতে পারি তারা নিজেদের ডিএইচ-৬৯ নামে পরিচয় দিচ্ছে। তখন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।”
অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে কিছু সদস্যের হাতে দেশীয় অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও ভিডিওগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একজন অভিভাবক বলেন, “কিশোর বয়সী ছেলেদের হাতে অস্ত্রসদৃশ কিছু দেখা গেলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। বিষয়টি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের মতে, সামাজিক মাধ্যমে ভয়ভীতি বা দাপট প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এমন ভিডিও প্রচার করা হলে তা অন্য কিশোরদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে ‘আতঙ্ক’ পরিচয়ের প্রচার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্রুপটির সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত আইডি থেকেও ডিএইচ-৬৯ নাম ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ পোস্টারধর্মী ছবি তৈরি করছেন, আবার কেউ ভিডিও সম্পাদনার মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী বা ভয়ংকর হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন।
সচেতন মহলের মতে, নিজেদের পরিচয়ের সঙ্গে ‘আতঙ্ক’ শব্দ ব্যবহার করা সামাজিকভাবে নেতিবাচক বার্তা দেয় এবং কিশোরদের মধ্যে গ্যাং সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে পারে।
কী এই ডিএইচ-৬৯?
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ডিএইচ-৬৯ নামটি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি দেখা যাচ্ছে। গ্রুপটির সদস্যদের বেশিরভাগই কিশোর ও তরুণ বয়সী। নিজেদের মধ্যে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতেই তারা এ নাম ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এ নামে কোনো নিবন্ধিত সংগঠন বা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে এটি একটি কিশোর গ্যাং বা অনানুষ্ঠানিক তরুণদের দল হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।
কেন বাড়ছে কিশোর গ্যাং?
সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের মতে, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, অনলাইন সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, বেকারত্ব এবং সহপাঠীদের চাপের কারণে অনেক কিশোর এমন গ্রুপে জড়িয়ে পড়ে।
একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন, “কিশোর বয়সে বন্ধুবান্ধবের প্রভাব অনেক বেশি থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ একসঙ্গে কাজ না করলে তাদের ভুল পথে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”
অভিভাবকদের মতে, সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম এবং তারা কার সঙ্গে মিশছে, সেদিকে আরও বেশি নজরদারি প্রয়োজন।
যা বলছে পুলিশ
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ও ছবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যদি অস্ত্র প্রদর্শন, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো কোনো কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা হবে না।”
স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
