বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

বাইরে কেবল অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ

প্রকাশিত : ৭:৫৫ পূর্বাহ্ন বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

করোনা ভাইরাসে ইতালিতে ক্রমেই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু হয়েছে ৭৫৬ জনের। এ নিয়ে সর্বমোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৭৯জন । আর আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৯৭ হাজর ৬৮৯ জন। এই অবস্থায় ইতালিতে থাকা প্রবাসি বাংলাদেশিরা শ্বাসরুদ্ধকর বাঁচার লড়াই করছেন। তাদের প্রতিটা মুহুত্য আতঙ্কে কাটছে। না পারছেন তারা দেশে আসতে না পারছেন থাকতে। দেশে ফেরার জন্য অনেক প্রবাসি ব্যাকুল হয়ে আছেন।কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ইতালিতে চলা ফেরায় কড়াকড়ি থাকায় গৃহবন্দি জীবন যাপন করছেন। এতেকরে তাদের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাইরে বের হলে পুলিশের জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে। বের হওয়ার সঠিক কারণ দেখাতে না পারলে জেল জরিমানার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যাদের ঘরে ছোট বাচ্চা আছে তাদেরকে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ইতালিতে থাকা বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলাপকালে তাদের এসব অসহায়ত্বের কথা উঠে এসেছে। ইতালির রোম থেকে মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, প্রথম দিকে করোনা ভাইরাস যখন ইতালিতে আঘাত আনে তখন ঘরে থাকতে মন্দ লাগেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক শুরু হয়। সরকারের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি শুরু হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় স্কুল কলেজ, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ ব্যবস্থা। চলাফেরায় সতর্ক করা হয়। অবাধে চলাফেরা করলে জবাবদিহিতা ও জেল জরিমানা করা শুরু হয়। এরপর থেকে আমরা ঘরের মধ্যেই আছি। বাজার ও ওষুধ কেনার জন্য শুধু বের হই। আর বাকি সময় ঘরের ভেতরে থাকি। নির্দিষ্ট সময়ে সুপার শপে বাজার করতে গেলে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যদিও সব ধরনের খাবার যথেষ্ট মজুত আছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় অসুস্থ হলে। চাইলেই হাসপাতালে যাওয়া যায় না। বেশি অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন দিলে বাসায় এসে নিয়ে যায়। স্বাভাবিক অসুস্থ হলে ব্যক্তিগত চিকিৎসককে ফোন দিলে তিনি ফোনেই ব্যবস্থা দেন। পরে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়। মিঠুন বলেন, ফোন হাতে নিলেই শুধু মৃত্যু সংবাদ আসে। টেলিভিশনে সামনে বসলে মৃত্যুর খবর। সব খবরই শুধু খারাপ আসে। এসব খারাপ খবরের মধ্য থাকতে থাকতে আমরা মানসিক সমস্যায় ভুগছি। বাঁচা মরার লড়াইয়ে আমরা অনেকটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। দেশে আমাদের স্বজনরাও আতঙ্কে আছেন। খবরে যখন তারা ইতালির মৃতের খবর পান তখন আরও বেশি চিন্তা করেন। আমরাও তাদেরকে নিয়ে চিন্তা করি।জানিনা এরকম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে কবে মুক্তি পাবো। ইতালির মিলান থেকে দেবশ্রী শিবা বলেন, কতটা দিন ধরে ঘরে বসেই সময় কাটাচ্ছি। বাইরে বের হওয়ার উপায় নাই। বলতে গেলে জেলখানায় আছি। কারো সঙ্গে দেখা হয় না।ছোট বাচ্চা আমার, ঘরে বন্দি থাকতে থাকতে বাইরে যাবার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। কত কিছু বলে যে তাকে বুঝাতে হয়। রীতিমত আমরা বাঁচার লড়াইয়ে আছি। সঙ্গে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। কী হবে কী হচ্ছে। কারণ মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। এখন সব দেশের শীর্ষে ইতালি অবস্থান করছে। কত মানুষ মরবে তার হিসাব নাই। কবে এই মহামারি থামবে সেটাও জানা নাই। আমাদের প্রত্যেক আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছেন ভয়ের মধ্য আছেন। খাবার দাবার যথেষ্ট থাকলেও আতঙ্কের মধ্য কেউ ঠিকমত খেতে পারছেন না।

ইতালির ভেনিশ থেকে মাহমুদুর রহমান চৌধুরী বলেন, এই মৃত্যুপুরীতে আমরা অন্যরকম দিন রাত পার করছি। সারাক্ষণ শুধু ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি। বৃদ্ধ আবাল বনিতা সবাই সৃষ্টিকর্তার দরবারে করোনা আক্রান্ত না হওয়ার ফরিয়াদ জানাচ্ছে। খাওয়া দাওয়া যেমন তেমন নামাজ পড়ে আল্লাহকে ডেকে আর টেলিভিশন মোবাইলে চোখ রেখেই দিন রাত কাটছে। বন্দি জীবন তাই রাত দিন এখন আমাদের কাছে সমান। ঘরের বাইরে শুধু অ্যাম্বুলেন্সের ডাক। কেউ অসুস্থ হলে ঘরের মধ্যই চিকিৎসা করতে হয়।চিকিৎসকরা বাসায় রেখেই মনিটরিং করে। সরকার এসব বিষয়ে খুব সতর্ক। মাহমুদুর বলেন, ইতালিতে এখন পর্যন্ত যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সীদের সংখ্যাই বেশি। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারতো। যদি না সবাই আইন মানতো। আইন মানার কারণে ও সরকারি সকল নির্দেশ মানাতে এই অবস্থা। না হলে হয়তো গণহারে মৃত্যু হতো মানুষের। তিনি বলেন, বাংলাদেশিরা যে যেখানে আছে তারা কেউ মানসিকভাবে ভালো নেই। সময় যত যাচ্ছে সবাই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। অনেকেই এই মৃত্যুপুরী থেকে পালাতে চাচ্ছে। বিশেষকরে ব্যাচেলরদের অবস্তা বেশি খারাপ। স্বজন ছাড়া এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এখন একটা প্রত্যাশা সৃষ্টিকর্তা যেন সবাইকে ভালো রাখে।

আরো পড়ুন