একশ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বারবার ভেঙে পড়ার মুখে শান্তি আলোচনা, আর শেষ মুহূর্তে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা— সবকিছু পেরিয়ে অবশেষে সমঝোতার পথে হাঁটতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কিন্তু কীভাবে এমন একটি চুক্তি সম্ভব হলো? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের দাবি, আলোচনার শেষ কয়েক ঘণ্টা ছিল সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। একাধিকবার আলোচনা থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতাই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সমঝোতার টেবিলে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। খবর আল জাজিরা
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার শেষ পর্যায়ে এমন অনেক মুহূর্ত এসেছিল, যখন মনে হচ্ছিল আলোচনা ভেঙে যাবে। তবে প্রতিবারই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আলোচনাকে সচল রেখেছিলেন বলে সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় পরিষদে জানান তিনি।
শেহবাজ বলেন, ‘এই পুরো সময়ে তিনি দিন-রাত জেগে কাজ করেছেন’। তার ভাষায়, আসিম মুনির ‘যুদ্ধের আগুন নেভাতে দিন-রাত উৎসর্গ করেছেন’। তিনি বলেন, বহুবার মনে হয়েছিল আলোচনা থেমে যাবে, কিন্তু সেনাপ্রধান হাল ছাড়েননি। এই যাত্রা যদি অব্যাহত না থাকত, তাহলে শান্তির স্বপ্ন ভেঙে যেত বলেও জানান শেহবাজ।
ফিল্ড মার্শাল কী রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না আন্তর্জাতিক, আসিম মুনির যেভাবে ছাপিয়ে গেলেন আইয়ূব খানকে
আল জাজিরা বলছে, জনসমক্ষে প্রায় পুরোপুরি আড়ালে থাকা এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে শেহবাজের এমন বিস্তারিত মন্তব্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে যে, কীভাবে পাকিস্তান এমন একটি সমঝোতা সম্ভব করেছে, যা অনেকের কাছেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
আর পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্যের পর শেহবাজ উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, তার দল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভিরও প্রশংসা করেন। পাশাপাশি মধ্যস্থতায় ভূমিকার জন্য কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও চীনের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আল জাজিরার পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনও মন্তব্য করেনি।
‘অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি’
পাকিস্তান অস্তিত্বের সংকটে পড়লে অর্ধেক বিশ্বকে নিয়ে ডুববে: আসিম মুনির
আল জাজিরা বলছে, সোমবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেহবাজ শরিফ প্রথম এই চুক্তির ঘোষণা দেন। চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। এর কিছুক্ষণ পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’
আগামী শুক্রবার জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে এবং এর আয়োজক হবে পাকিস্তান। ইরানের মেহর বার্তাসংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির আশপাশে মোতায়েন থাকা বাহিনী সরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চুক্তির আওতায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি আবার স্বাভাবিকভাবে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদও পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার সময় ধাপে ধাপে ছাড় করা হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে দুই পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা করবে।
‘আরও কঠোর জবাব দেয়া হবে’, ভারতকে আসিম মুনিরের হুঁশিয়ারি
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের বিষয়টি আপাতত আলোচনার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর। আর এই আলোচনা হয়েছে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে। তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত হওয়ার পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সোমবার শেহবাজ শরিফ বিশেষভাবে মোজতবা খামেনির নাম উল্লেখ করে বলেন, আলোচনার সময় তিনি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে অসাধারণ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।
‘হাল না ছাড়া কূটনীতি’
পরোক্ষ বৈঠক নয়, আসিম মুনিরের সভাপতিত্বে ইতিহাস গড়ল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
তবে এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পথ মোটেও সহজ ছিল না। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের দেয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা ছিল খুবই নাজুক।
পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, আসিম মুনির ও শেহবাজ শরিফের ‘ব্যক্তিগত অনুরোধে’ ট্রাম্প সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন। ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের পর দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি যোগাযোগ।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই আলোচনায় অংশ নিলেও কোনও চুক্তি ছাড়াই তা শেষ হয়। এরপর কয়েক সপ্তাহ মুখোমুখি আলোচনা আর শুরু হয়নি। এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে দুই পক্ষ ফোনেও কথা বলতে পারে।
যেভাবে বিশ্ব মঞ্চে প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে উঠলেন পাকিস্তানের আসিম মুনির
এদিকে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে গেলেও প্রকাশ্যে অগ্রগতির বিষয়ে খুব কমই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক জওহর সেলিম বলেন, ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার এই প্রক্রিয়া আসলে কূটনীতিতে ‘হাল না ছাড়া’ মনোভাবের একটি উদাহরণ।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটা এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কী বদলেছে, সেই প্রশ্ন নয়। বরং এটি দেখায় যে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য কোনও মধ্যস্থতাকারী দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত সমাধান আনতে পারে।’
তার মতে, পাকিস্তানের কাজ ছিল শুধু দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন করা নয়, বরং বিশেষ করে ইরানের ভেতরে বাস্তববাদী ও কট্টরপন্থিদের মধ্যকার বিভাজন সামাল দিতেও সহায়তা করা।
সেলিম বলেন, ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে— বিশ্বস্ত বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা।’
চীনের সম্পৃক্ততা
তবে পাকিস্তান একা কাজ করেনি। চলতি বছরের ৩১ মার্চ পাকিস্তান ও চীন যুদ্ধ বন্ধে পাঁচ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করে। হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের কারণে চীনের তেল ও গ্যাস আমদানিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকেই বেইজিং এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিল।
এরপর মে মাসে আসিম মুনির দ্বিতীয়বারের মতো তেহরান সফর করেন। তার সঙ্গে ছিলেন মহসিন নকভি। পাকিস্তানের এই প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে সোমবার উল্লেখ করেন শেহবাজ শরিফ।
একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও একাধিকবার ইসলামাবাদ সফর করেন। তিনি আলাদাভাবে আসিম মুনির ও শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। এক সফরে আরাগচি বলেছিলেন, ‘ফল না আসা পর্যন্ত’ পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে তেহরান।
শেষ মুহূর্তের টানাপোড়েন
গত শনিবার আলোচনার শেষ পর্যায়ে ইসহাক দার সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন বলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে পাকিস্তানের ধারাবাহিক ও অব্যাহত মধ্যস্থতার প্রশংসা করেন।
একই দিন শেহবাজ শরিফ ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত সম্মতিপূর্ণ খসড়া’ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা কখনও এতটা কাছে আসেনি’। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য তাদের আলোচক দল শিগগিরই কোথাও যাচ্ছে না। এতে বোঝা যায়, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল।
এছাড়া চুক্তির তথ্য ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলা হলে তেহরানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ প্রশ্ন তোলেন, ওয়াশিংটনের আদৌ তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা বা সক্ষমতা আছে কি না।
তবে কঠোর বক্তব্যের মধ্যেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইঙ্গিত দেন যে কূটনীতির পথ এখনও খোলা রয়েছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অবশ্য আলোচনার শেষ মুহূর্তের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে বা কীভাবে সমঝোতাটি টিকিয়ে রাখা গেল, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে জানা গেছে, বৈরুতে হামলার জেরে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই শেহবাজ শরিফ এক্সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির ঘোষণা দেন। আর তার কয়েক মিনিট পর ট্রাম্পও সেটি নিশ্চিত করেন।
আর সেটাকে সামনে এনে সোমবার পার্লামেন্টে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টার জন্য পাকিস্তান যে সম্মান ও মর্যাদা পেয়েছে, তা অর্জনের জন্য বহু দেশ দশকের পর দশক চেষ্টা করেছে।’
সূত্র: চ্যানেল২৪