কক্সবাজারের পেকুয়ায় জমি সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে উল্টো কারাগারে যেতে হয়েছে এক কলেজছাত্রী ও তাঁর মাকে। পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ঘটনার পর থানায় উপস্থিত হয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা–মেয়েকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কারাগারে কলেজছাত্রী ও তাঁর মা
কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—পেকুয়া উপজেলার সাবেক গুলদি এলাকার মৃত নুরুল আবছারের মেয়ে জুবাইদা জান্নাত (২৩) এবং তাঁর মা রেহেনা মোস্তফা রানু (৪৮)।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জুবাইদা জান্নাত চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগারের দর্শনার্থী ফটকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন জুবাইদা জান্নাত।
জমি বিরোধের মামলা ও তদন্ত
নিজেদের পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধের জেরে জুবাইদা জান্নাত চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশি মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পেকুয়া থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
পরে থানার ওসি খাইরুল আলম মামলার তদন্তভার দেন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পল্লবকে।
‘প্রতিবেদন পক্ষে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা নেন’
ভুক্তভোগী জুবাইদা জান্নাত অভিযোগ করেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তাঁর পক্ষে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এসআই পল্লব তাঁর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন।
কিন্তু পরে তদন্ত প্রতিবেদন উল্টো তাঁদের বিপক্ষে দেন।
টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ
জুবাইদা জান্নাত জানান, বুধবার বিকেলে তিনি ও তাঁর মা পেকুয়া থানায় গিয়ে এসআই পল্লবের কাছে ঘুষ বাবদ দেওয়া টাকা ফেরত চান।
এ সময় এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে মা–মেয়েকে বেধড়ক মারধর করেন। পরে থানায় আটকে রেখে ইউএনওকে ডেকে আনা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে এসে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মা–মেয়েকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন এবং পরে তাঁদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
লিখিত অভিযোগেও প্রতিকার মেলেনি
মামলার আইনজীবী চকরিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কৌশলী এডভোকেট মিজবাহ উদ্দীন বলেন,
জুবাইদা জান্নাত এসআই পল্লবের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে পেকুয়া থানার ওসি এবং চকরিয়া সার্কেলের এএসপির কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।
উল্টো অভিযোগ করার পর কলেজছাত্রী ও তাঁর মাকে অন্যায়ভাবে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মনজিলা বেগম (৬০) বলেন, তিনি জুবাইদা ও তাঁর মায়ের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে এসআই পল্লবের সঙ্গে তাঁদের মামলার বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়।
তিনি দাবি করেন, কথোপকথনে তিনি শুনেছেন যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পক্ষে দেওয়ার কথা বলে এসআই পল্লব ২০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে প্রতিবেদন বিপক্ষে দেওয়ায় জুবাইদা টাকা ফেরত চাইলে এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের মারধর শুরু করেন।
পরে মহিলা পুলিশ এসে তাঁদের থানার গেটে নিয়ে গিয়ে আবারও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের প্রশ্ন
জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল সাংবাদিকদের বলেন,
“আমার বোনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন বিপক্ষে দেওয়া হয়েছে। পরে টাকা ফেরত চাইলে উল্টো নির্যাতন করে জেলে পাঠানো হয়েছে। এটা কোন ধরনের আইন?”
তিনি আরও বলেন,
“দুইজন নারী থানায় গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা করবে—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
প্রশাসনের বক্তব্য
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, থানায় কিছু বিষয় নিয়ে গোলযোগ হয়েছিল এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়া ও পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁকে জানানো হয়।
তিনি বলেন, “থানা থেকে আমাকে অবগত করা হলে আমি সেখানে গিয়ে বিষয়টি দেখে খারাপ আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে মা–মেয়েকে এক মাসের সাজা দিয়েছি।”
তবে এসআই পল্লবের সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি পরবর্তী তদন্তে বেরিয়ে আসবে।”
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেন, থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।