মোবাইল ফোনে হঠাৎ একটি নোটিফিকেশন। সেটিতে ক্লিক করার পর স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘সিস্টেম আপডেট’ বার্তা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফোনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন ব্যবহারকারী। এরপর একে একে খালি হয়ে যায় ব্যাংক হিসাব। টাকা কোথায় গেল, কারা নিল—এর কোনো হদিস থাকে না।

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের সাইবার প্রতারণার বহু ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারকরা অর্থ দ্রুত বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এক ব্যবসায়ীর সাড়ে সাত লাখ টাকার প্রতারণার ঘটনা দীর্ঘ তদন্তের পর নতুন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে।

নোটিফিকেশনে ক্লিক, তারপরই বিপদ
সাতকানিয়ার ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দীনের মোবাইলে গত ৭ এপ্রিল একটি সন্দেহজনক নোটিফিকেশন আসে। সেটিতে ক্লিক করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি আপডেট প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ফোনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
পরে জানতে পারেন, তাঁর জিমেইল, পাসওয়ার্ড ম্যানেজার এবং ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তথ্য প্রতারকদের দখলে চলে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে লোহাগাড়া ও কেরানীহাট এলাকার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের দুটি হিসাব থেকে ধাপে ধাপে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।
মামলা থেকে তদন্ত
তদন্তের জটিলতা বিবেচনায় শুরুতে মামলাটি রেকর্ড করতে অনীহা দেখায় সাতকানিয়া থানা। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে মামলা গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে ছায়াতদন্ত শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) রাসেল আহমেদের নেতৃত্বে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল তদন্তে নামে। কিন্তু শুরুতেই বড় বাধার মুখে পড়েন তাঁরা।
অর্ধশতাধিক অ্যাকাউন্টের গোলকধাঁধা
তদন্তে দেখা যায়, প্রতারণার অর্থ মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য বিকাশ, নগদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করতে গিয়ে পাওয়া গেছে আরও কয়েকটি নতুন অ্যাকাউন্ট। আবার সেসব অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে আরও বিভিন্ন স্তরে।
অনেক ক্ষেত্রে সিম নিবন্ধিত একজনের নামে হলেও সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে অন্য ব্যক্তির পরিচয়ে। কোথাও এনআইডির প্রকৃত মালিকের খোঁজ নেই, কোথাও আবার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে ভিন্ন ব্যক্তি। ফলে প্রতিটি সূত্র তদন্তকারীদের সামনে নতুন ধাঁধা তৈরি করছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করতে বারবার বিকাশ, নগদ এবং বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠাতে হয়েছে। শত শত পৃষ্ঠার নথি, কেওয়াইসি তথ্য, সিম নিবন্ধনের রেকর্ড, ডিভাইস তথ্য এবং ক্যাশ-আউটের বিবরণ বিশ্লেষণ করতে হয়েছে তদন্তকারীদের।
বারবার অচলাবস্থা, তবু হাল ছাড়েননি তদন্তকারীরা
একটি লেনদেন অনুসরণ করতে গিয়ে দেখা গেছে, সেটি আবার কয়েকটি নতুন অ্যাকাউন্টে ভাগ হয়ে গেছে। সেখান থেকে আরও কয়েক ধাপে অর্থ সরানো হয়েছে। প্রতিটি স্তরের উদ্দেশ্য ছিল মূল হোতাদের পরিচয় আড়াল করা।
তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, এমনও সময় এসেছে যখন পুরো অনুসন্ধান কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছিল। তবে বিরতি নিয়ে আবার নতুনভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পুরোনো সূত্র যাচাই করে ডিজিটাল ট্রেইল অনুসরণ অব্যাহত রাখা হয়।
একাধিক ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান এবং টেলিযোগাযোগ অপারেটরের তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে প্রতারণা চক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক।
দুই মাস পর মিলল সূত্র
প্রায় দুই মাস ধরে চলা অনুসন্ধানে একপর্যায়ে বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো জোড়া লাগতে শুরু করে। একটি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আরেকটি, একটি সিমের সঙ্গে একটি ডিভাইস, একটি ক্যাশ-আউট পয়েন্টের সঙ্গে অন্য লেনদেনের সম্পর্ক খুঁজে পান তদন্তকারীরা।
অবশেষে অর্ধশতাধিক স্তরের আর্থিক লেনদেন অনুসরণ করে প্রতারণা চক্রের সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় জেলা ডিবি।
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও ও সীতাকুণ্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ইকবাল (৩৬) ও মো. রুবেল (৩৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, তাঁদের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন, ১৮টি বিকাশ নিবন্ধিত সিম, আটটি ব্যাংক চেকবই এবং তিনটি ব্যাংক কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
যেভাবে কাজ করত চক্রটি
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল আহমেদ বলেন, চক্রটি প্রথমে ভুক্তভোগীদের জিমেইল ও অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিত। এরপর ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অর্থ স্থানান্তর করত।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থ একাধিক ধাপে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সরিয়ে এর উৎস গোপন করা হতো। পরে সেই অর্থ অনলাইন জুয়া, গরুর ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করা হতো।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া ইকবালের বিরুদ্ধে ফেনী ও নোয়াখালী জেলায় একই ধরনের অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে। রুবেলের বিরুদ্ধেও প্রতারণাসংক্রান্ত মামলা আছে। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
যে দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে প্রতারকরা
তদন্তে উঠে এসেছে আর্থিক সেবাখাতের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়ও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী সিমের মালিক এবং মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টধারী একই ব্যক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই যাচাই কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তদন্তে এমন বহু অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে, যেখানে সিম নিবন্ধিত একজনের নামে হলেও বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে অন্য ব্যক্তির পরিচয়ে। কিছু ক্ষেত্রে এনআইডির প্রকৃত মালিক জানেনই না যে তাঁর পরিচয় ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট চালু করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু এজেন্ট যথাযথ যাচাই ছাড়া অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ায় প্রতারক চক্র সহজেই ভুয়া বা ভাড়া করা অ্যাকাউন্টের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারছে।
প্রতিরোধে কী প্রয়োজন
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, কেওয়াইসি যাচাই আরও কঠোর করা, সন্দেহজনক লেনদেন তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা এবং ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সাইবার প্রতারণার বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তাঁদের ভাষ্য, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়; আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করাও সমান জরুরি।