রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ইংরেজি শুরু হোক প্রাথমিকেই

প্রকাশিত : ২:২৭ পূর্বাহ্ন রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

 

ইংরেজি আমাদের ভাষা নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহূত এবং সারা বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য এক নম্বর ভাষা হওয়ায় এটি আমাদের জন্যও অত্যাবশকীয় একটি ভাষায় পরিণত হয়েছে। আমাদের শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলকভাবে আমাদের ইংরেজি শিখতে হয়। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিপ্রাপ্তি এবং উন্নত ক্যারিয়ারের জন্যও ইংরেজিতে পারদর্শিতা অর্জন জরুরি হয়ে পড়ে। ইংরেজিকে এখন শুধু একটি ভাষা হিসেবেই গণ্য করা হয় না, এটিকে একটি টেকনোলজিও বলা হয়। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই টেকনোলজির ব্যবহারে যে যত বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারছে সে তত বেশি উন্নতি করতে পারছে!

স্কুল-মাদ্রাসা, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা নির্দিষ্ট কারিকুলাম অনুসরণ করে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশুনা করছি। শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই আমরা ইংরেজি পড়ছি। পরীক্ষায় পাশ করছি। ভালো নম্বরও হয়তো পাচ্ছি। কিন্তু ইংরেজিতে আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর একটা সহজাত জড়তা ও ভয় থাকেই। যার ফলে এ বিষয়ে তাদের দুর্বলতা দিন দিন বাড়তে থাকে। একটা সময় তারা এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ে। অথচ এক জন শিক্ষার্থী ইংরেজিতে দুর্বল হলেও অন্য বিষয়গুলোতে সে হয়তো ভালোও হতে পারে। কিন্তু ইংরেজিতে খারাপ হওয়ার কারণে সে হয়তো অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারে না!

ছোটবেলা থেকে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং বাসায় ইংরেজি পড়ছি। প্রত্যেক ক্লাসের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যবই আছে। কিন্তু আমরা ইংরেজিতে বাংলার মতো সাবলীল নয়। ব্যাপক চর্চা ও ব্যবহার ছাড়া সাবলীল হওয়ার কথাও না। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তাই, বলা যায় বাংলায় আমরা সব ধরনের পড়াশুনা ও যোগাযোগ অত্যন্ত সাবলীলভাবেই করতে পারি। ঘরে-বাইরে আমাদের পরিবেশটাও বাংলায় এবং বাংলা চর্চার জন্যই শতভাগ উপযোগী। ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশটা এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন। তাই তারা ছোট থেকেই ইংরেজিতে অভ্যস্ত হতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারের সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। আবার বিদ্যমান বাস্তবতায় দেশের সব শিক্ষার্থীর ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ারও প্রয়োজনীয়তা নেই!

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক বইপুস্তক থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে দক্ষতা, দখল ও পারদর্শিতা অর্জন করার জন্য এবং ইংরেজি ভাষার ব্যবহারে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠার জন্য প্রাথমিক পর্যায় থেকে যেভাবে ইংরেজি পড়াশুনা ও চর্চা করা দরকার সেভাবে করছে না। এখানে আমি বলছি না যে, তাদের ইংরেজির চাপে ভারাক্রান্ত করে ফেলতে, বরং আমি বলতে চাচ্ছি—ছোটবেলা থেকে সময়ের কাজ সময়ে না করার ফলে ইংরেজিতে তাদের যে সমস্যা ও দুর্বলতা তৈরি হয়, মূলত সেটিই তাদের ঘায়েল করে ফেলে। আমাদের অনেক ভালো ভালো সার্টিফিকেটও তখন কোনো কাজে আসে না!

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল ভালো থাকার পরেও তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে ইংরেজিতে খারাপ করছে, সেটির পেছনে নিশ্চয়ই একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তো আছেই। এই খারাপ করার কারণটি তিন মাস বা ছয় মাসের সৃষ্ট কারণ নয়, বলা যায় এটি তার পূর্ববর্তী বারো-তেরো বছরের পড়াশুনার ফল। যেখানে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে এক জন শিক্ষার্থীর প্রতিটি বিষয়ে পর্যায়ক্রমে প্রায় সমানতালে উন্নতি হওয়ার কথা সেখানে অহেতুক ভয় ও জড়তায় ইংরেজিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পিছিয়ে পড়ে! তাছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে নতুন নতুন প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন করতে হলে ইংরেজিতে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দখল থাকা চাই। শিক্ষাজীবন ও চাকরিজীবনে বিদেশে বিভিন্ন স্কলারশিপ, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন ও বিদেশে ভালো একটা চাকরির জন্যও ইংরেজিতে ভালো হওয়া জরুরি।

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় তাদের কথা বাদ দিলাম, মাধ্যমিক পর্যায়ের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনকালে আমি অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করে দেখেছি—ইংরেজি বিষয়ে দক্ষ হতে পারলে ভবিষ্যতে তাদের কী কী লাভ হবে, আবার এ বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে বা অদক্ষ হলে তাদের কী কী ক্ষতি হতে পারে সেটি তারা জানেই না, এমনকি ধারণা করেও ঠিকভাবে বলতে পারে না! এরকম অবস্থা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে সচেতনতা ও ইংরেজির প্রতি আকর্ষণ কীভাবে তৈরি হবে?

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে, এটিকে পরিচালনা করতে হলে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ দেশকে সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে হলে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সেভাবে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে যথাযথভাবে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কারিকুলামের আওতায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে সব ক্লাসের জন্যই মানসম্মত ইংরেজি পাঠ্যবই রয়েছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো শিক্ষার্থী বেশি পড়াশুনা করতে চাইলে তার জন্যও বাজারে অগণিত সহায়ক বই রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতিতে ইংরেজি শেখা ও চর্চার জন্য অসংখ্য প্ল্যাটফরমও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় যত্ন, আগ্রহ, মনোযোগ এবং উত্সাহের অভাবে ইংরেজিতে ভালো বা দক্ষ হয়ে উঠছে না। যার ফলে তারা ইংরেজিভীতি নিয়েই বড় হতে থাকে।

শেষ কথা হলো—প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ইংরেজিভীতি দূর করে ইংরেজি শেখাকে তাদের জন্য আনন্দের বিষয়ে পরিণত করা অত্যন্ত দরকার। ইংরেজি শেখায় তাদের ব্যাপক আগ্রহী করে গড়ে তোলে তাদের মধ্যকার সহজাত ভয় ও জড়তা দূর করা দরকার। মূলত একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাতি গঠনে প্রাথমিকেই শিক্ষার্থীদের ইংরেজিপ্রীতি সৃষ্টি ও সাহস সঞ্চারের বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমানে প্রতিটি শ্রেণির জন্য আমাদের যেমন মানসম্মত পাঠ্যবই রয়েছে তেমনি যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক রয়েছে। শিক্ষকরা যদি পাঠ্যবই অনুসারে শ্রেণিভিত্তিক পাঠদান সুন্দরভাবে করেন এবং প্রতিদিন প্রয়োজনীয় অনুশীলন নিশ্চিত করেন, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শিক্ষায় উত্সাহিত করতে পারেন, তাহলে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের বুনিয়াদ তৈরি হতে বাধ্য এবং তারা দিন দিন ইংরেজিতে আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হয়ে উঠবে।

লেখকঃ
শরীফ উল্যাহ
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

আরো পড়ুন