বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

রাঙ্গামাটি -খাগড়াছড়ি সহ ২২ টি সড়কের ২ঘন্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ

প্রকাশিত : ৯:২৮ পূর্বাহ্ন বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

হত্যাকারীর ফাঁসির দাবীতে

খোরশেদ আলম শিমুল,দেশবাংলা.নেট
হাটহাজারীতে নিখোঁজ হওয়া তাসনিম সুলতানা তুহিন (১৩) নামের এক স্কুল ছাত্রীর গলিত লাশ উদ্ধার করেছে মডেল থানা পুলিশ। রবিবার(১৬ সেপ্টেম্বর)রাত ৯টার দিকে পৌরসভার ফটিকা গ্রামের শাহজালাল পাড়ার সালাম ম্যানশনের ৪ তলার একটি বাসার ড্রয়িং রুম থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর পুলিশ তুহিনের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ঘাতক বখাটে শাহনেওয়াজ মুন্না পুলিশের হাতে আটক রয়েছে। নিহত তুহিন হাটহাজারী গালর্স হাই স্কুল এন্ড কলেজের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী এবং ঐ ভবনের মালিক উপজেলার গড়দুয়ারা ২নং ওয়ার্ডের নিয়ামত আলী সারাং বাড়ির আবু তৈয়বের কন্যা। অপরদিকে ঘাতক বখাটে যুবক শাহানেওয়াজ মুন্না পৌরসভার চন্দ্রপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহাজানের পুত্র। হত্যাকান্ডের স্বীকার তুহিনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী,শিক্ষক,পরিচালনা কমিটির সদস্য,ও সর্বস্থরের জনগন স্বঘোষিত খুনি মুন্নার ফাঁসির দাবীতে উপজেলার কলেজ গেটে সোমবার সকাল সাড়ে এগারটার দিকে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এসময় দুই পার্বত্বজেলা রাঙামাটি -খাগড়াছড়ি সহ ২২ টি সড়কের আনুমানিক ২ঘন্টা পর্যন্ত কোন ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। এতে করে ২২টি সড়কের হাজার হাজার যাত্রীসাধারন চরম দুর্ভোগে পড়ে।

থানা সূত্রে জানা যায়, রবিবার সন্ধ্যার দিকে পুলিশকে দেয়া ঘাতকের তথ্যের ভিক্তিতে হাটহাজারী সার্কেল এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাসুম, হাটহাজারী মডেল থানার ওসি বেলাল উদ্দীন জাহাংগীর, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শামিম শেখ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বখাটে যুবক শাহানেওয়াজ মুন্নার বাসার ড্রয়িং রুমের সোপার নিচ থেকে নিখোঁজ তুহিনের প্রায় পঁচন ধরা লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। বখাটে শাহানেওয়াজ মুন্নার পরিবার একই ভবনের চতুর্থ তলার ঐ ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া হিসাবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছিল। এ ঘটনায় ভিকটিমের বড় ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আকিব জাবেদ বাদী হয়ে খুনি মুন্না,তার মা নিগার সুলতানা এবং বাবা পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহাজান সহ তিনজনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেছে,যার নাম্বার ২৫।
এদিকে লাশ উদ্ধার করে থানায় আনার পরেই রাত সাড়ে ৯টার দিকে উত্তেজিত জনতা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে হাটহাজারী থানার সামনে ব্যারিকেট দিয়ে এমন নির্মম জঘন্য হত্যাকা-ের সুষ্ঠু বিচার দাবী করে। এসময় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়ে হাজার হাজার যাত্রী সাধারণকে চরম দূর্ভোগে পড়তে দেখা গেছে। পরে হাটহাজারী মডেল থানার ওসি বেলাল উদ্দীন জাহাংগীর রাত এগারোটার দিকে গিয়ে থানার প্রধান ফটকে উক্তেজিত জনতার সামনে হত্যাকান্ডের সুষ্ঠ বিচারের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে উত্তেজিত জনতা রাত এগারোটার দিকে মহাসড়ক থেকে ব্যারিকেট তুলে নিলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এবং নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র হ্জ্ব পালনের জন্য গিয়ে বর্তমানে সৌদি আরবে অবন্থান করছেন নিহত তুহিনের বাবা মা। আগামী বুধবার তারা হজ পালন শেষে দেশে ফিরে আসার কথা। শুক্রবার(১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তুহিন ভবনের নিচ তলা নানার বাসা থেকে তাদের বাসা ২য় তলায় প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার জন্য বের হয়ে নিখোঁজ হয়। পরে আশেপাশে অনেক খোঁজাখুজি করেও তাকে পাওয়া না গেলে ওই দিন সন্ধ্যায় নিখোঁজের ঘটনায় স্থানীয় মডেল থানায় ডায়েরিও করা হয়েছিল। তবে ঘাতক বখাটে মুন্নাকে নিহতের পরিবারের সন্দেহ হচ্ছে বলে পুলিশকে জানালে ঐদিন শুক্রবার রাতেই বখাটে মুন্নার বাসায় তল্লাশী চালিয়েও তুহিনের সন্ধান পায়নি পুলিশ। পরে তুহিনের পরিবার ও স্থানীয়রা বখাটে মুন্নাকে আটক করে পুলিশের হাতে তোলে দিলেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে তাকে ছেড়ে দেয়। স্থানীয়রা জানায়, তুহিনকে হত্যা করে বখাটে মুন্না তার বাসার সোপার নিচে লাশ লুকিয়ে রাখে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড হয়ে থাকতে পারে। এদিকে নিখোঁজের ২ দিন পর হত্যাকান্ডের স্বীকার তুহিনের শরীরে পঁচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে বাসা ছেড়ে খুনি মুন্নার বাবা,মা কৌশলে সরে পড়ে এবং বেকায়দায় পড়ে যায় বখাটে মুন্না। তাই রবিবার বিকালে ধরা খেয়ে গন পিটুনির ভয়ে সে নিজেই মডেল থানায় গিয়ে পুলিশকে ধরা দিয়ে স্বীকারোক্তি দেয়। পরে তার দেয়া স্বীকারোক্তি মোতাবেক হত্যা করে লুকিয়ে রাখা সোফা সেটের নিচ থেকে প্লাষ্টিকে বস্তাবন্ধী তুহিনের লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। খুনি বখাটে মুন্না ছাত্র রাজনীতি,ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরণের মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলেও সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তা মডেল থানার এসআই জসিম উদ্দীন জানান, নিখোঁজ ডােয়রী করার পর থেকে তুহিনকে উদ্ধার করতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছি,বেশ কয়েকবার স্কুলেও গেছি আবার ঘাতক মুন্নাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদও করেছি। আজও তদন্তে গিয়ে ফেরার পথে বাজারের মোড়ে ত্রিবেনী মিস্টির দোকানের সামনে থেকে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসি। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে হত্যা করে লাশ লুকিয়ে রাখার কথা স্বীকার করলে পুলিশ গিয়ে প্লাষ্টিক মোড়ানো অবস্থায় তুহিনের গলিত লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাটহাজারী মডেল থানার ওসি বেলাল উদ্দীন জাহাংগীর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, কি কারণে এ হত্যাকান্ডের ঘটনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং উদ্ধার করা লাশটি ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরন করা হয়েছে। আটক মুন্নাকে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছে এবং ময়না তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে এবং মাললার পলাতক আসামীদের আটক করতে পুলিশের অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সোমবার সকাল ১০টার পর চট্টগ্রাম রাঙামাটি সড়কে নেমে পড়ে নিহত তুহিনের স্কুল কলেজের সহপাঠী ও শিক্ষার্থীরা সহ সর্বস্তরের জনতা। তারা প্রথমে মুন্নার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করে।পরে তারা চট্টগ্রাম রাঙামাটি সড়ক থেকে কাচারী সড়ক হয়ে খাগড়াছড়ি রামগড় সড়কে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনে গিয়ে শেষ হয়। এসময় দুই পার্বত্বজেলা রাঙামাটি -খাগড়াছড়ি সহ ২২ টি সড়কের আনুমানিক ২ঘন্টা পর্যন্ত কোন ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। এতে করে ২২টি সড়কের হাজার হাজার যাত্রীসাধারন চরম দুর্ভোগে পড়ে।এ যানজন নিরসন করতে চরম বেগ পেতে হয়েছে থানা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের।দুই ঘন্টা স্থায়ি এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে বিভিন্ন বক্তারা বলেন ,ঘাতক মুন্নার ফাঁসি, মাদক ও ইয়াবা বন্ধ করার দাবি জানান। এছাড়া ঘাতক মুন্নার ফাঁসির দাবিতে হাটহাজারীর সর্বস্তরের জনসাধারন ও বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে মিছিলে মিছিলে এ মানববন্ধনে যোগ দেয়।
অপরদিকে পুলিশের চরম অবহেলার কারনে হাটহাজারীর বিভিন্ন ইউনিয়নে ও আনচে কানাচে বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকহারে মাদক ও ইয়াবা ব্যবসা। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে ইয়াবার হাট বসে।স¤ম্প্রতি ইয়াবার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে হাটহাজারী মডেল থানা পুলিশের তিনজন এস আইকে অন্যত্রে বদলী করা হয়েছে। তুহিন হত্যার ঘাতক মুন্না সহ আরো বেশ কয়েকজন শাহ জালালপাড়া এলাকায় মাদক ও ইয়াবা ব্যবসায় নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। সরকারিদলের রাজনৈতিক চত্রছায়ায় এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যচ্ছে বলে এলাকার সুশিল সমাজের অভিযোগ।
পুলিশ গত সোমবার ঘাতক মুন্নাকে আদালকে প্রেরন করেছে। সোমবার উপজেলার পশ্চিম গড়দুয়ারা ২নংওয়ার্ডস্থ বাইতুন নাঈম জামে মসজিদ সংলগ্ন ময়দানে আছরের নামাজের পর তুহিনের জানাযার নামজ শেষে পারিবারিক করবস্থানে দাফন করা হবে।

আরো পড়ুন