বাংলাদেশ, , রোববার, ১৬ জুন ২০১৯

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হুমকির মুখে পড়বে স্বাধীন সাংবাদিকতা

প্রকাশ: ২০১৮-০৯-১৫ ০৮:৫৬:২৮ || আপডেট: ২০১৮-০৯-১৫ ০৮:৫৬:২৮

মঙ্গলবার বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলের ওপর প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই বিলের ওপর সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন পেশ করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল’ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটিকে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে এ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি প্রস্তাবিত এই বিলটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার আগে সংশোধনীর তাগিদ দিয়েছেন সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, প্রস্তাবিত এই আইন বাস্তবায়িত হলে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে ‘ডেইলি স্টার’ সম্পাদক মাহ্‌্‌ফুজ আনাম মানবজমিনকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটি, আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছিল। দুই দফা আলোচনায় আমরা যে আভাস-ইঙ্গিত পেয়েছিলাম বিশেষ করে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম এবং পরবর্তীকালে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আমাদের সঙ্গে বসবে। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে আমাদের যে মূল দাবিগুলো ছিল সেগুলো বিকৃত হয়েছে বলে আমি মনে করি। এখানে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার স্বাধীনতা একেবারেই সুরক্ষিত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি যে এভাবে একটি ব্যুরোক্রেসি স্ট্রাকচারের মধ্যে গণমাধ্যমের পুরো স্বাধীনতা শৃঙ্খলিত হচ্ছে। এই আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কম্পিউটার তল্লাশি করা, সিজ করা, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বন্ধ করা এবং প্রয়োজনবোধে গ্রেপ্তারের অধিকার দেয়া হয়েছে। এটি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম। প্রেস কাউন্সিল একটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। তার আইনি কাঠামো আছে। যা কিছু হবে ওখানে শুনানি হবে। প্রেস কাউন্সিল থেকে যদি অনুমতি দেয়া হয় যে নিয়মের লঙ্ঘন হয়েছে তাহলে পদক্ষেপের ব্যাপার হতে পারে। আরেকটি প্রস্তাব করেছিলাম যে, দেশে যে তথ্য অধিকার আইন আছে, সেই আইনে গণমাধ্যমের জন্য যে ধরনের স্বার্থরক্ষা হয়েছে সেগুলো যেন সমুন্নত থাকে। একই সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন এবং এই আইনে কোথাও যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তথ্য অধিকার আইন প্রাধ্যান্য পাবে। কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুই রক্ষিত হয়নি বলে আমাদের ধারণা। আমি মনে করি এভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।’

‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তার একটিও গ্রহণ না করা খুবই দুঃখজনক। সেই সময় আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অসঙ্গতিপূর্ণ ধারাগুলো বাদ দেয়া হবে। কিন্তু এর একটিও বাদ না দিয়ে শুধু শব্দগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেটি সাংবাদিকদের অধিকারের জায়গাটুকু হরণ করার মতো, সেগুলো বহাল রেখে এই আইন পাস করার যে প্রক্রিয়া তৈরি করা হচ্ছে এবং সংসদীয় কমিটির যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে আমি এটিকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করছি। তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতেও দেখেছি, এধরনের কালাকানুন পাস হয়েছে। যার পরিণতি শুভকর হয়নি।’ নঈম নিজাম বলেন, সামাজিক গণমাধ্যমের জন্য সরকার আলাদা আইন করতে পারতো এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতো। কিন্তু সেটি না করে মূলধারার গণমাধ্যমকে আরো কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই আইন পাস করা হচ্ছে। আমি আশা করবো, এখনো সময় আছে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার আগে সংশোধনী এনে এ জায়গাগুলো সরকার পরিবর্তনের ব্যবস্থা করবে। এর অন্যথা হলে বাংলাদেশের আগামী দিনের গণমাধ্যম হুমকির মুখে পড়বে।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি চূড়ান্ত করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন টিআইবি’র (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল সংবিধানের মূলনীতির পরিপন্থি। অংশীজনদের মতামত অগ্রাহ্য করে গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা হরণের ঝুঁকিপূর্ণ ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল’-এর বিতর্কিত ধারাসমূহ অপরিবর্তিত রেখে সংসদীয় কমিটি কর্তৃক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। এই আইন প্রণয়নে সরকারকে আরো দূরদর্শী হওয়ার আহবান জানান ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, একদিকে প্রস্তাবিত বিলের ৮, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারাগুলোর ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বেগ ও মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা তাদের স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে বিতর্কিত ৩২ ধারার ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ অনুসরণের সুপারিশ করার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত হতাশা ও দুঃখজনক।

তিনি বলেন, সরকারের ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে দুর্নীতি প্রতিরোধ সুশাসন নিশ্চিত হওয়ার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে প্রস্তাবিত আইনটি সেক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারার অপপ্রয়োগের ফলে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত তথ্য জানার আইনি অধিকার ব্যাপকভাবে রুদ্ধ হবে। এছাড়া এই ধারাটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং যেকোনো ধরনের গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে, যা সংবিধানের মূল চেতনা, বিশেষ করে মুক্তচিন্তা বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশের পথ ব্যাপকভাবে রুদ্ধ করবে

Comments

Add Your Comment

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

MonTueWedThuFriSatSun
     12
3456789
17181920212223
24252627282930
       
  12345
       
1234567
891011121314
22232425262728
2930     
       
    123
       
    123
45678910
25262728   
       
 123456
78910111213
14151617181920
28293031   
       
     12
24252627282930
31      
   1234
567891011
2627282930  
       
     12
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031