শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

সাতক্ষীরায় ৪০ বছরে ৯ ইউপি চেয়ারম্যান খুন

প্রকাশিত : ১০:২৩ অপরাহ্ন শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

মোশাররফের হত্যার মোটিভ খুঁজছে পুলিশ * কর্মসূচি দেবে জাতীয় পার্টি

কালীগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউপি চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টি নেতা কেএম মোশাররফ হোসেনের হত্যাকাণ্ডের মোটিভ খুঁজতে মাঠে নেমেছে পুলিশ। কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় জেলার ৭৮টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। প্রভাব বিস্তার ও রাজনৈতিক কারণে ৪০ বছরে সাতক্ষীরায় ৯ জন ইউপি চেয়ারম্যান খুন হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজন জাতীয় পার্টির নেতা রয়েছেন।

শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কৃষ্ণনগর বাজারে স্থানীয় যুবলীগ অফিসে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মোশাররফ কালীগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন তিনি। তার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন জানান, মোশাররফের হত্যার ঘটনায় জাতীয় পার্টি কর্মসূচি দেবে। তিনি বলেন, দলীয় কাজে আমরা ঢাকায় রয়েছি। সোমবার ফিরে কর্মসূচি দেব। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনে খুলনা বিভাগে জয়ী একমাত্র জাতীয় পার্টি নেতা ছিলেন মোশাররফ। এদিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার বিকালে মোশাররফের লাশ কৃষ্ণনগরে আনা হয়। সন্ধ্যায় কৃষাণ ও মজদুর হাইস্কুল মাঠে জানাজা শেষে কেজি স্কুল প্রাঙ্গণে তার লাশ দাফন করা হয়।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান হাফিজুর রহমান জানান, কয়েকটি ঘটনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। আগস্টে সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষ্ণনগর ইউপি সদস্য আবদুল জলিল জানিয়েছিলেন, দক্ষিণ রঘুনাথপুর গ্রামের আবু মালাইকার বাড়িতে চেয়ারম্যান মোশাররফের নেতৃত্বে লোকজন হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করেছে। এ ঘটনায় মোশাররফের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে মোশাররফের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী মোস্তফা কবিরুজ্জামান, ইসরাইল হোসেন, মোস্তফা আবু হেনা বিশ্বাসসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা উপস্থিত ছিলেন। মোশাররফের নানা অপরাধ ও মামলার খতিয়ান তুলে ধরে তার অপসারণ দাবি করে তারা বলেন, মোশাররফের কারণে নিরীহ মানুষ এলাকায় টিকতে পারছে না। পুলিশকে গোপন তথ্য দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে আটক করিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। তিনি সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী। মোশাররফের হত্যার পেছনে ইউপি সদস্যের এই বিরোধকে প্রধান কারণ বলে ধারণা করছে পুলিশ ও এলাকাবাসী। মোশাররফের হত্যার পর জলিলসহ কয়েকজন পালিয়ে গেছে। এছাড়া সম্প্রতি এলাকার মহসিন ডাকাত নামের এক ব্যক্তিকে কৃষ্ণনগর বাজারে কে বা কারা কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় মোশাররফের সমর্থকদের নামে মহসিন মামলা করেন। এ মামলা তুলে নেয়ার শর্তে তার চিকিৎসার টাকাও দেন মোশাররফ। এই বিষয়ে ঘটনার রাতে যুবলীগ অফিসে মহসিনের সঙ্গে সালিশ বৈঠকে বসার কথা ছিল তার। এই মহসিনের সঙ্গে ইউপি সদস্য জলিলের সুসম্পর্ক রয়েছে। জলিল ও মহসিন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

সাপখালি খাল বন্দোবস্ত নিয়ে কৃষ্ণনগরের নুর ইসলাম ও তার সহযোগী গোপালগঞ্জের দিঘলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ওবায়দুল মাছচাষ করায় কৃষ্ণনগর, মৌতলা ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সম্প্রতি খালটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। কৃষ্ণনগর, মৌতলা ও বিষ্ণুপুরের চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় প্রশাসন খালটি উন্মুক্ত করে। এতে নুর ও ওবায়দুল ক্ষিপ্ত হয়। মোশাররফ হত্যার পেছনে এটিও কারণ হতে পারে।

চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই এলাকায় একটি গ্রুপ পরিচালনা করে আসছেন মোশাররফ। আর এই গ্রুপের অন্যতম নেতা হলেন ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি ও ইউপি সদস্য ফজলুর রহমান। ফজলুর সঙ্গে মোশাররফের সুসম্পর্ক পছন্দ করে না অপর একটি গ্রুপ। ঘটনার রাতে মোশাররফ যুবলীগ অফিসে বসে ইউপি সদস্য ফজলুর ও মহসিনকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। জানা গেছে, মোশাররফের বাবা সহিলউদ্দিন কাগুজি কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের কয়েকদিন পর তাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

৪০ বছরে ৯ ইউপি চেয়ারম্যান খুন : ১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট তালা সদর ইউপি চেয়ারম্যান জুম্মা খাঁ চরমপন্থীদের হাতে নিহত হন। ১৯৮৯ সালে ডুমুরিয়া বাজারে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ ওরফে মজিদ মাস্টার নিহত হন। ১৯৯০ সালে ডুমুরিয়ার শোভনা ইউপি চেয়ারম্যান অতুল কৃষ্ণ ও ১৯৯১ সালে রুদাঘরা ইউপি চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হোসেন তোজাম, ১৯৯৫ সালের ৩১ মার্চ তালার খলিসখালির সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা মোক্তার খাঁ নিহত হন। ১৯৯৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খলিসখালি ইউপি চেয়ারম্যান লক্ষ্মীকান্ত সরকার ও ২০০৪ সালের ৪ মে তালার পাটকেলঘাটা বাজারে সন্ত্রাসীদের ছোড়া বোমা ও গুলিতে সরুলিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা এবিএম আলতাফ হোসেন ও তার এক সহযোগী নিহত হন। আলতাফ উপজেলা চেয়ারম্যানও ছিলেন। ২০০৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ভারতের নদীয়ায় ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। আলমগীর চরমপন্থী নেতা মৃণালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর তালার ধানদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা আরিফুল ইসলাম চঞ্চল এবং ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর আগরদাঁড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আনারুল ইসলামকে হত্যা করা হয়।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাগুরা ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস শাহাবুদ্দিন আহমেদকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সময় প্রতিপক্ষের হামলায় তালার নগরঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল বারী সরদার নিহত হন। এর আগে উপজেলা ডুমুরিয়ার সদর ইউপি চেয়ারম্যান কামাল হোসন নিহত হন।

আরো পড়ুন